নোয়াখালীর মাইজদীর হৃদয় হোসেন। কাজের সন্ধানে কয়েক বছর আগে ঘর ছেড়ে আসেন ঢাকায়। পরে তার দুই ভাইও পরিবার নিয়ে আসেন রাজধানীতে। মিরপুরের ৬০ ফুট এলাকায় কম টাকায় নেন ঘরভাড়া। পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন হৃদয় ও তার দুই ভাই। মুদিখানার দোকানে কাজ করে সংসার চালাতেন তারা। তিন ভাই মিলে বর্তমানে মিরপুরে মুদিখানার দোকান দিয়েছেন। সেখানে চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সব ধরনের মুদিপণ্য বিক্রি করেন। দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিটিয়ে মাসে লাখ টাকার বেশি আয় তাদের, যা দিয়ে খুব ভালোভাবে চলছে হৃদয় ও তার ভাইদের পরিবার।
হৃদয় ও তার দুই ভাইয়ের মতো অসংখ্য মানুষের অবদানে দেশের অর্থনীতির প্রাণ হয়ে উঠছে খুচরা-পাইকারি বাজার। ডিস্ট্রিবিউটিভ ট্রেড পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য নিয়ে গঠিত। দেশের সেবাখাতের প্রধান অঙ্গ বাণিজ্যখাত ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোট দেশজ উৎপাদনে অর্থাৎ জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ। জিডিপির হিসাব নির্ণয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ১৫টি খাতের মধ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ। খাতটি ঘিরে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সবশেষ ‘বিতরণ ব্যবসা জরিপ’র প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া যায়।
বিবিএসের তথ্যমতে, শিল্প ও কৃষিখাতের পরই (তৃতীয়) এ খাতের অবস্থান। বর্তমানে খাতটির মোট আকার রেকর্ড করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই খাতে মোট মূল্যসংযোজন করা (জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত) হয়েছে চার লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। দেশে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৬টি। এর মধ্যে খুচরা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮৭ হাজার ২০৩টি, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৮৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বিতরণ বাণিজ্য তিনটি বিভাগ নিয়ে গঠিত। মোটরগাড়ি, মোটরসাইকেল ও মেরামত সম্পর্কিত সব কার্যক্রম। মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল মেরামত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই লাখ ১৬ হাজার ৭১৪টি, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল ছাড়া পাইকারি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই লাখ ৪২ হাজার ৭২৯টি, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বছরে ১০-১৫ লাখ টাকার টার্নওভার করেন। এসব বাণিজ্য সেক্টরে কাজ করছেন ৮৬ লাখ ২৭ হাজার ৯২০ জন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে নারীর চেয়ে পুরুষের উপস্থিতি বেশি। বাণিজ্যখাতের মোট পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে পুরুষ ৯৭ দশমিক ২৭ এবং নারী ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বেশির ভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হয়। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী অবৈতনিক।
তেমন একজন আবু বকর সিদ্দিকী। তিনি খুলনার খালিশপুরের নবীর ইসলামের ছেলে। দীর্ঘদিন তারা রাজধানীতে বসবাস করছেন। মিরপুর বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে তার বাবার ফলের দোকান। ২৫ বছরের বেশি সময় তিনি সেখানে ব্যবসা করছেন। বাবা বৃদ্ধ, চলাফেরা করতে পারেন না। তিন বছর আগে সেই ব্যবসার হাল ধরেন আবু বকর সিদ্দিকী।
আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, বাবা ২৫ বছর ব্যবসা করেছেন। ওনার এখন বয়স হয়েছে। চলাফেরা করতে পারেন না। ফলে ব্যবসা আমাকেই দেখতে হচ্ছে। দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে বাসাভাড়াসহ সংসার চলে। এর বাইরে ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার যাবতীয় খরচও ব্যবসা থেকে আয় হওয়া টাকায় চলছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বেতনভুক্ত কর্মচারীর সংখ্যাও কম নয়। তারাও এ খাতে অবদান রাখছেন। তাদেরই একজন রুবেল মিয়া। তার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। জীবিকার তাগিদে চলে আসেন রাজধানীতে। বর্তমানে মিরপুরের একটি পাইকারি দোকানের কর্মচারী। তার মাসিক বেতন ১২ হাজার টাকা।
রুবেল মিয়া বলেন, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছি। চাকরি কই পাবো? তবে দোকানে কাজ করে ভালোই চলছে। মাসে ১২ হাজার টাকা পাই। ঘরভাড়াসহ নিজের খরচ মিটিয়ে এ টাকার অর্ধেকের বেশি চলে যায়। বাকি টাকা গ্রামে বাবা-মায়ের জন্য পাঠাই।
এদিকে, খুচরা-পাইকারি পণ্য সরবরাহে যানবাহন ব্যবহার করা হয়। এসব যান মেরামতের দোকানেও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে।
মিরপুর কাউন্দিয়া এলাকায় যানবাহন মেরামতের কাজ করেন সুজন মোল্লা। তার বাড়ি ফরিদপুরে। কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন কয়েক বছর আগে। তিনিও ক্লাস থ্রি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তবে যানবাহন মেরামতে দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। এ কাজে তার বেশ সুনামও রয়েছে। কাজ করে তিনি মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করেন।
অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বছরে গড়ে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার করেন। অনেকে আবার সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। তাদেরই একজন ঝিনাইদহের মধুমতি হ্যাচারি অ্যান্ড ফার্মের মালিক মোহাম্মদ মিথুন। তার ফার্ম থেকে লেয়ার মুরগির লাল ডিম সংগ্রহ করা হয়। ঢাকার পাইকারি বাজারে ফার্মের ডিম সরবরাহ করেন মিথুন। প্রতি মাসে গড়ে ২৫-২৬ গাড়ি ডিম সরবরাহ করেন তিনি। প্রতি গাড়িতে ২০-২৫ হাজার ডিম থাকে। পাশাপাশি কোয়েল পাখির বাচ্চাও সরবরাহ করেন মিথুন।