শনিবার ● ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ● ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যুরহস্য, যেসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২১ পিএম  (ভিজিট : ২৮)

নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর ব্যবহৃত নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার, মৃত্যুর আগে সর্বশেষ সঙ্গে থাকা পরিচিত এক তরুণের বক্তব্য এবং বাসার গ্যারেজের সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ নামের এক তরুণকে। তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে সেদিনের শেষ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন, কী করেছিলেন এবং কীভাবে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

নৌ পুলিশ ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও গোয়েন্দা পুলিশ ঘটনাটি ছায়া তদন্ত করছে।

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের তিনি জানিয়েছিলেন, ‘দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে দেখা করে আসি।’ এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি।

তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে উত্তরখান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরদিন বুধবার বিকেলে টঙ্গী নৌ পুলিশের সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।

তাহসিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের সময় বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে ওঠার ভিডিও ধারণ বা প্রচারের সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়টি তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন জল্পনা তৈরি করে। তবে প্রায় তিন মাস আগে একটি সাক্ষাৎকারে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তাহসিফ।

শেষ সঙ্গী দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদ

তাহসিফের বাবা জানিয়েছিলেন, দ্বীপের ডাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাঁর ছেলে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে।

বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; কয়েকটি বিষয়ে তথ্য জানার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হয়।

শুক্রবার সকালে পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদ রহমান গণমাধ্যমকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে সেখানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ‘তারা কী জন্য এখানে এসেছিল, সেটা আমাদের এখনো বলে নাই। দ্বীপ বলেছে, তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। কেন এখানে তারা এসেছিল, সেটি আমরা তদন্ত করছি।’

পিবিআই মূলত দ্বীপের বক্তব্যের সঙ্গে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের মিল খতিয়ে দেখছে। তাহসিফের সঙ্গে তিনি কেন এতক্ষণ ছিলেন, কখন ও কীভাবে তাঁদের আলাদা হওয়া হয় এবং ঘটনার পরপরই পরিবার বা পুলিশকে বিষয়টি কেন জানানো হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর পুলিশ সুপার বিবিসি বাংলাকে জানান, তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা যাওয়ায় দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য ও আলামত বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা তাহসিফ ও দ্বীপের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ এবং দ্বীপের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

মাজার বস্তি থেকে উদ্ধার মোটরসাইকেল

তাহসিফের বাসার গ্যারেজের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে আসেন দ্বীপ। পরে সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটের দিকে দুজনকে দুটি পৃথক মোটরসাইকেল নিয়ে গ্যারেজ থেকে বের হতে দেখা যায়।

পরদিন তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার হলেও তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার রাতে দ্বীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাইয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই।

পুলিশ জানায়, দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে নিশ্চিত হয় পিবিআই।

পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদ রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গাড়িটা আমরা রাতেই উদ্ধার করছি। দ্বীপের দেওয়া তথ্য অনুসারেই গাড়িটা উদ্ধার করা হয়েছে।’

মোটরসাইকেলটি যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকে তুরাগ নদে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান খুব বেশি দূরে নয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে শুক্রবার দুপুরে তুরাগ নদের যে স্থান থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, সেটি পরিদর্শন করেন পিবিআইয়ের তদন্তকারী দল। দ্বীপকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থানেও যাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এখনো হয়নি মামলা

মরদেহ উদ্ধারের প্রায় এক দিন পর শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তের পাশাপাশি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে কোথায় গিয়েছিলেন এবং শেষ সময়ে কী ঘটেছিল, তা জানতে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই করা হচ্ছে।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর পুলিশ সুপার বিবিসি বাংলাকে জানান, নিহতের পরিবার শোকাহত থাকায় মামলা দায়েরের বিষয়ে তাদের কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে। তবে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ওনাদের একটু সময় দিচ্ছি, মামলা হবে। যেহেতু নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছে, তাদের তত্ত্বাবধানেই মামলা কার্যক্রম চলবে। অন্য সব সংস্থা তাদের সহায়তা করবে।’

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর করা সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং দ্বীপের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: মাহফুজুর রহমান রিমন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]