যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম সনদ কর্মসূচি থেকে ভারতের কয়েকটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি কম্পানিকে সাময়িকভাবে বাদ দিয়েছে দেশটির সরকার। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন করে স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন করতে পারবে না।
আগে জমা দেওয়া যেসব আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন, সেগুলোর কাজও বন্ধ থাকবে।
ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজ জানায়, বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং। এ সময় তার পাশে ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এই সিদ্ধান্তের আওতায় রয়েছে ভারতের কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো ও এইচসিএল।
এ ছাড়া ফ্রান্সভিত্তিক ক্যাপজেমিনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সন্ডারলিং বলেন, বিশ্বের কয়েকটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে নতুন কোনো স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও এগোবে না।
তার দাবি, ২০০৯ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য প্রায় ৩০ লাখ আবেদন করেছে। তারা এইচ-১বি ভিসার জন্য দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া স্থায়ী শ্রম সনদের অনুমোদন পেয়েছে এক লাখের বেশি।
সন্ডারলিংয়ের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কর্মীদের কাছ থেকে কয়েক লাখ চাকরি কেড়ে নিয়েছে।
স্থায়ী শ্রম সনদ হলো যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে নিয়োগদাতারা বিদেশি কর্মীদের জন্য গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে পারেন।
মাইক্রোসফটের কঠোর সমালোচনা করেছেন জেডি ভ্যান্স। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে। ভ্যান্স বলেন, ২০২৫ সালে মাইক্রোসফট ছয় হাজার মার্কিন কর্মীকে ছাঁটাই করে। একই বছর প্রতিষ্ঠানটি ছয় হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পায়। এ ছাড়া স্থায়ী চাকরির জন্য শ্রম সনদ পেতে তিন হাজার ৬৮২টি আবেদন করে।
ভ্যান্সের দাবি, এসব আবেদনের মধ্যে প্রায় এক হাজারটি ছিল সেই পদগুলোর জন্য, যেসব পদ থেকে মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে হয়। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট শহরের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করে, ওই পদে কোনো মার্কিন নাগরিক আবেদন করেননি। এরপর তারা বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমতি চায়।
ভ্যান্সের অভিযোগ, এভাবে নিয়মের সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে তাদের জায়গায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে। তিনি এইচ-১বি ভিসায় নিয়োগ পাওয়া বিদেশি কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ দাস’ বলে আখ্যা দেন। এ কর্মসূচি ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি ‘ভিসা তৈরির কারখানা’ বলেও মন্তব্য করেন।
ভ্যান্সের ভাষ্য, দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য চালু করা ভিসা কর্মসূচি ব্যবহার করে মার্কিন কর্মীদের বেতন কমানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না। জে-১ ভিসায় গবেষক নিয়োগ দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন তিনি। তার দাবি, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি এই ভিসা ব্যবহার করে মার্কিন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বেতন কমিয়ে দিচ্ছে।
আমেরিকানদের চাকরি রক্ষার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের নিয়ম আরো কঠোর করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তুলনামূলক কম খরচে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করে। এতে স্থানীয় কর্মীরা চাকরির সুযোগ হারাচ্ছেন।
গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি অস্থায়ী কর্মভিসার জন্য এক লাখ ডলার ফি আরোপের পরিকল্পনার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছে। এইচ-১বি ভিসার আওতায় প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি অনুমোদন পাওয়া বিদেশি কর্মীদের বড় অংশই ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকম। সংগঠনটির দাবি, দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগও বাড়িয়েছে।
এক বিবৃতিতে ন্যাসকম জানায়, অভিবাসন এবং দক্ষ কর্মীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখা উচিত। সংগঠনটি আরো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে এইচ-১বি ভিসা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও কর্মীসংকট মোকাবেলায় এ কর্মসূচি প্রয়োজন হতে পারে।
ন্যাসকমের দাবি, ভারতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন-৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন উদ্ভাবন ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করার পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।