
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আগামী বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বাংলায় ভাষণ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি হবে তার প্রথম ভাষণ। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি এই বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন।
এর আগে তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘ সফর ও ভাষণে বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের জাতীয় অগ্রাধিকার, উন্নয়ন ভাবনা ও বৈশ্বিক ইস্যুগুলো উঠে এসেছে।
জিয়াউর রহমান: স্বনির্ভরতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব
১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ভাষণ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, স্বনির্ভর উন্নয়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পায়।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাপ, খাদ্যঘাটতি, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও কম মাথাপিছু আয়ের মতো উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাবও দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়।
এ ছাড়া উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান জিয়াউর রহমান।
খালেদা জিয়া: গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ফারাক্কা ইস্যু
১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তার বক্তব্যে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অধিকার গুরুত্ব পায়।
খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরে তিনি বিষয়টিকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের জন্য স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পরিবেশ ও উন্নয়ন নিয়েও বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। শিল্পোন্নত দেশগুলোর দূষণের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির দায় তাদের নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তিনি জাতিসংঘে তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, সাক্ষরতার হার বাড়ানোর উদ্যোগ, ডাল-ভাত কর্মসূচি, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ।
তারেক রহমান: গণতন্ত্র, জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকট
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তার ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আধুনিক প্রযুক্তিতে সমান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুযোগ এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ও তার বক্তব্যে স্থান পাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।
রোহিঙ্গা সংকটও এবারের সফরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও আলোচনায় থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরবে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। এবারের অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের ভাষণ থেকে খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের বক্তব্য এবং এবার তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ—তিনটি সময়পর্বেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরার ধারাবাহিকতা দেখা যায়।