আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক চাপ কমাতে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছিল।
### আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় কয়েক মাস দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
এতে বিপিসির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও প্রায় পাঁচ মাস দেশের বাজারে আর মূল্য সমন্বয় করা হয়নি।
### ডিজেলে লিটারে ৮৯ টাকা লোকসান
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজেল বিক্রি না করায় বিপিসিকে প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে সংস্থাটির দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বার্ষিক লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।
নতুন করে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
### পাচার ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
দেশের বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। কম দামের সুযোগ নিয়ে সীমান্তপথে জ্বালানি তেল পাচার হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে একই সঙ্গে পাচারের ঝুঁকি কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিপিসির লোকসান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
### এলএনজি আমদানিতেও ব্যয় বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানি তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে। দেশে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সরকারকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, বিপিসির ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ—এই কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
নতুন মূল্য কার্যকরের ফলে একদিকে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে পরিবহন ও শিল্পসহ জ্বালানি-নির্ভর বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।