একটি ঘর, কারও কাছে হয়তো নিছক চার দেয়াল আর একটি ছাদ। কিন্তু সেই ঘরই যখন কোনো অসহায় পরিবারের কাছে নিরাপত্তা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন একটি ঘরের মূল্য হয়ে যায় অমূল্য।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের জীবনে সেই ঘরটুকুও নেই। নিজের নামে নেই এক শতাংশ জমি, নেই মাথা গোঁজার মতো কোনো ঠিকানা। অন্যের গরু রাখার জন্য তৈরি ছোট্ট একটি গোয়ালঘরই এখন তাঁর সংসার। সেই অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চলছে তাঁদের জীবনযুদ্ধ।
শুক্রবার বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের সেই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, গরু রাখার জন্য নির্মিত ছোট্ট ঘরটিই যেন একটি পরিবারের পুরো পৃথিবী। ঘরের এক পাশে সামান্য কিছু সংসারের জিনিসপত্র। অন্য পাশে স্ত্রী ও সন্তানদের থাকার ব্যবস্থা। নেই স্বাভাবিক জীবনের কোনো উপকরণ, নেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা। তবুও সেই ঘরেই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটছে তাঁদের।
সোহেল নিজেও অসুস্থ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারে নেই কোনো স্থায়ী আয়। তার ওপর স্ত্রী দুই কিডনি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ।
একসময় তিনি ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করতেন। কিন্তু অসুস্থতার কাছে হার মেনে সেই পথও এখন বন্ধ।
একদিকে চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে খাবারের চিন্তা সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই যেন তাঁদের কাছে একেকটি কঠিন পরীক্ষা। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না।
চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই, আবার অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করাও সম্ভব নয়। অভাব যেন পরিবারটির প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে।
সবচেয়ে কষ্টের ছাপ পড়েছে সন্তানদের জীবনেও।
১৩ বছর বয়সী বড় ছেলের হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, কাঁধে থাকার কথা স্কুলব্যাগ। চোখে থাকার কথা বড় হয়ে কিছু করার স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চাপে সেই স্বপ্ন থেমে গেছে। সংসারের অভাব তাকে স্কুল ছেড়ে দোকানে কাজ করতে বাধ্য করেছে।
আর সাত বছরের ছোট ছেলে এখনো প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দারিদ্র্যের এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সে বিদ্যালয়ে যায়। হয়তো তার ছোট্ট চোখে এখনো রয়ে গেছে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন, একদিন সে পড়াশোনা করবে, বড় হবে, আর পরিবারের এই কষ্ট দূর করবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির জন্য সবার আগে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে পরিবারটি অন্তত নিরাপদে থাকার একটি ঠিকানা পেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটির এমন দুরবস্থা দেখে আসছেন তাঁরা। সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের জন্য একটি ঘর অত্যন্ত জরুরি।
সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো এগিয়ে এলে পরিবারটির কষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
অবশেষে আশার আলো
অসহায় এই পরিবারের দুর্দশার খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে সরেজমিনে ছুটে যান সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।
সোহেলের গোয়ালঘরসদৃশ বসতঘরে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। নিজ চোখে দেখেন তাঁদের অসহায়ত্ব, অভাব আর মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র।
পরিবারটির অবস্থা দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই, আবার আয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
তিনি জানান, সালথা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়ারও চেষ্টা করা হবে।
দবির উদ্দিন আরো বলেন, একটি ঘর, হয়তো খুব বড় কিছু নয়। একটি ছোট দোকান, হয়তো তাতেও বদলে যাবে না পুরো পৃথিবী। কিন্তু সোহেলের পরিবারের কাছে এই উদ্যোগই হতে পারে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।