ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধের নামে নাগরিকদের ওপর কোনও ধরনের অন্যায় বা নিপীড়ন চালানো হবে না বলে জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করতে হয়। তবে সেই বলপ্রয়োগ আইনসম্মত, যথাস্থানে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তিনি বলেন, “আইনের নামে আমরা নিপীড়ন চালাবো কিনা— এটাই মূল প্রশ্ন। উত্তর হচ্ছে, না। আমরা তা করবো না। কারণ আমরা কোনও ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া রেজিম নই। আমরা একটি গণতান্ত্রিক সরকার।”
সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সংস্কার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গুমের অভিযোগ, মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ, মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন নিয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
পুরোনো কাঠামো নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে
বিগত সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব না দিলে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে থাকা রাষ্ট্রীয় কাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “একটি দেশ দীর্ঘদিন এই ধরনের সরকারের অধীনে থাকলে সেই ব্যবস্থার লোকজন বিভিন্ন জায়গায় থেকে যান। খুব দ্রুত সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলা কঠিন। তবে গভীরভাবে দেখলে বোঝা যাবে, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের একটি রাজনৈতিক অংশ বদলায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল প্রশাসনিক কাঠামো থেকে যায়। দেশের সব পর্যায় বিবেচনায় এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা লাখ লাখ।”
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “আমরা যেভাবে এই ব্যবস্থাটাকে পেয়েছি, তার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। কাজ চলছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে কিছুটা সময় লাগবে। জনগণের প্রতি আমাদের অনুরোধ, তারা যেন কিছুটা ধৈর্য ও সহানুভূতি রাখেন। আমরা আশা করছি, আরও কিছুদিন গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
‘সরকারকে কেউ ভয় পায় বলে মনে হয় না’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো অতীতে বিভিন্ন আইন অপব্যবহারের নজির তুলে ধরে নতুন ব্যবস্থারও অপপ্রয়োগ হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অতীত অভিজ্ঞতার কারণে নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক।”
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। নাগরিকদের ভয় পাওয়ার কারণ আছে। অতীতে আইন ব্যবহার করে নিপীড়ন চালানো হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের দিকে তাকালে কি মনে হয়, সরকারকে কেউ ভয় পাচ্ছে?”
তিনি বলেন, “সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নিয়ে সমালোচনা, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ হচ্ছে। তাকেও ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রূপ করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারের অনেক ভুল হবে। সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, সমালোচনা করতে হবে, প্রয়োজনে বিদ্রূপও করা যাবে। এতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু কোনও একটি বিষয়ে ভয় বা উদ্বেগ আছে— এই যুক্তিতে আইন ভাঙার সুযোগও নেই।”
‘রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ হতে হবে পরিমিত’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আইন প্রয়োগ ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পার্থক্য তৈরি হয়।”
তিনি বলেন, “প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র বলপ্রয়োগটি আইনসম্মতভাবে করছে কিনা, সঠিক জায়গায় করছে কিনা এবং পরিমিতভাবে করছে কিনা। আমরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করি।”
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, রাস্তায় কোনও বিশৃঙ্খলা হলে পুলিশকে কখনও কখনও বলপ্রয়োগ করতে হয়। যে পরিস্থিতি লাঠিচার্জ বা জলকামান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেখানে গুলি চালানো গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক সরকার এমন কাজ করবে না। গণতান্ত্রিক সরকারের মাথায় রাখতে হয়, তাকে জনগণের কাছে যেতে হবে এবং জনগণকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে।”
সরকার কোনও নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তার কারণ জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “আমরা যদি কোনও ব্যবস্থা নিই, জনগণকে বোঝাতে হবে কেন সেটি নেওয়া হয়েছে। তাদের কনভিন্স করতে হবে যে ব্যবস্থাটি ন্যায্য ছিল এবং জনস্বার্থে নেওয়া হয়েছে।”
বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় আইনজীবী প্যানেল
তথ্য উপদেষ্টা জানান, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই এবং আইনি পরামর্শ নিশ্চিত করতে একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “কোনও তথ্য সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই সেটিকে বিভ্রান্তিকর তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। আবার কোনও ব্যক্তি ভুল তথ্য বা অপপ্রচারের শিকার হয়ে প্রতিকার চাইলে সরকার তার বিষয়টিও বিবেচনা করবে।”
ভাস্কর্য অপসারণের মতো কোনও ঘটনাকে যাচাই না করে জঙ্গি বা উগ্রবাদীদের কাজ বলে প্রচার করা হলে সেটি কীভাবে মূল্যায়িত হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ঘটনার পূর্বাপর প্রেক্ষাপট, তথ্যের উৎস এবং উপস্থাপনের ধরন যাচাই করতে হবে।
“কেউ যদি আগের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে প্রশ্ন করেন— কোনও উগ্রবাদী গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত কিনা— তাহলে সেটিকে সরাসরি অপরাধ বলা যাবে না। এসব বিষয় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে। একারণেই আইনজীবীদের একটি প্যানেল করা হয়েছে।”
১৮০ দিনের কাজের হিসাব দেবে সরকার
তথ্য উপদেষ্টা জানান, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন কাজ করার কথা ছিল, কী সম্পন্ন হয়েছে এবং কোনটি হয়নি— তার হিসাব প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আগামী ১৬ আগস্টের কাছাকাছি সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমাদের একটি বৈঠক রয়েছে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা বসে হিসাব করার চেষ্টা করছি—১৮০ দিনে কী করার কথা ছিল, কী হয়েছে, আর কী হয়নি।”
তার মতে, সরকারের এই পর্যালোচনা জবাবদিহির অংশ। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “আমরা কেন এত হিসাব করছি? কারণ আমরা জবাবদিহি করতে চাই। নাগরিকদের ওপর অন্যায়ভাবে কোনও কিছু চাপিয়ে দিলে রাজনৈতিকভাবে আমাদেরই ক্ষতি হবে— এটা আমরা বুঝি।”
কামাল ও বেনজীরকে ফেরানোর বিষয়ে আপডেট নেই
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারত থেকে এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এ বিষয়ে তার কাছে তাৎক্ষণিক কোনও আপডেট নেই।”
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘রেড টেলিফোন’ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কেও তিনি কোনও তথ্য দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, “এই তিনটি বিষয়ে আমি এখন পর্যন্ত কোনও আপডেট দিতে পারছি না। সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে তথ্য নিয়ে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে। প্রশ্নগুলো আমরা নোট করে রাখছি।”
শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে যা বললেন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় পাসপোর্ট, ইমিগ্রেশন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও কাস্টমসসহ একাধিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে পৃথক মামলা হয়নি কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে তার বক্তব্য ব্যক্তিগত, সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়।
তিনি বলেন, “তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত এবং দণ্ডপ্রাপ্ত। সম্ভবত একারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে অন্য আইনে উদ্যোগ নেয়নি। তবে যেখানে যেখানে আইন লঙ্ঘন হয়েছে, তার অন্তত একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকা দরকার।”
আইন লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনা করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মন্ত্রিসভায় রদবদলের খবর ‘মিডিয়াতেই দেখছেন’
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পর মন্ত্রিসভায় রদবদল হতে পারে কিনা জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়ে তার কাছে নিশ্চিত কোনও তথ্য নেই। আমিও গণমাধ্যমে এই আলোচনা দেখছি। এর বেশি কিছু জানি না।”
তবে প্রধানমন্ত্রী কোনও মন্ত্রী বা উপদেষ্টার কাজ সন্তোষজনক মনে না করলে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন বা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন। তার যদি মনে হয়, কেউ ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে দফতর পুনর্বণ্টন বা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কোনও সিদ্ধান্ত আরও ভালো করার সুযোগ থাকলে তিনি নিশ্চয়ই তা করবেন। তবে প্রতি ১৮০ দিন পর এমন পরিবর্তন হবে— এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন।”
ভাস্কর্য অপসারণে উগ্রবাদীদের সম্পৃক্ততার তথ্য নেই
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনায় সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে জেলা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ ২০১৯ বা ২০২০ সালের দিকে শুরু হলেও সেটি সম্পূর্ণ হয়নি। ভাস্কর্যে বীরশ্রেষ্ঠের মুখাবয়ব যথাযথভাবে ফুটে ওঠেনি— এমন অভিযোগ ছিল।”
এছাড়া সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে উঁচু বেদির ওপর ভাস্কর্যটি থাকায় যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল।
তিনি বলেন, “এটি জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা ভেঙে ফেলেছে— এমন তথ্যের সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক নেই। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন একটি উপযুক্ত জায়গায় বীরশ্রেষ্ঠের যথাযথ অবয়ব এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে।”
ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাইলস্টোনের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া সরকারেরও ব্যর্থতা
মাইলস্টোন দুর্ঘটনার এক বছর পরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি— এমন অভিযোগের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ক্ষতিপূরণ ঘোষিত হয়ে থাকলে তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছানো সরকারের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “ঘোষিত ক্ষতিপূরণ যদি বিতরণ না হয়ে থাকে, তাহলে তা যেন দ্রুত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে— সে বিষয়ে সরকার অবশ্যই কাজ করবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তদন্তের ভিত্তিতে তৈরি সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করবে।
“একটি বর্ষপূর্তিতে এসে যদি আমাদের শুনতে হয় যে পরিবারগুলো এখনও ক্ষতিপূরণ পায়নি, তাহলে সেটি দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের দায়িত্ব নেওয়ারও প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেছে। এটিকে আমাদেরও কিছুটা ব্যর্থতা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। আমরা সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবো।”
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও সরকার ২০ লাখ টাকা প্রস্তাব করেছে— এই বিষয়ে তিনি বলেন, “অর্থ দিয়ে প্রাণহানির প্রকৃত ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রকে তার সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।
“প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তুলবো। প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধি বসতে পারেন। তাদের সব দাবি শুনে বিবেচনা করা উচিত।”
নিহত শিশুদের শহীদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাবিটি যাচাই করতে হবে।”
‘ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান’ সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ
পাঁচ মাসে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরে দুর্বল ও বিকৃত হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, “সরকারের কিছু প্রশাসনিক হাতিয়ার থাকে। যারা ১৭ বছর একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাদের চিন্তাও বদলে গেছে। এই পুরো কাঠামো নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।”
তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অতীতেও নিখুঁতভাবে কাজ করেছে— এমন নয়। তবে বর্তমানে এগুলো যে মাত্রায় ভেঙে পড়েছে, তা নজিরবিহীন।
পুলিশ বাহিনীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচিত সরকারের অধীনে বাহিনীটি কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফেরেনি।
“এখনও রাস্তায় পুলিশ সদস্যদের প্রতি চালক, রিকশাচালক ও সাধারণ মানুষের আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখা যায়। এটি শুধু জুলাইয়ের ট্রমা নয়, এর আগেও পুলিশকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।”
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে কাজ করার সুযোগ এবং জনগণের সহযোগিতা দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জনগণের প্রত্যাশার চাপও বড় চ্যালেঞ্জ
তথ্য উপদেষ্টার মতে, সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের বিপুল প্রত্যাশা।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন মানুষ একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সরকার পায়নি। ফলে অনেক প্রত্যাশা জমে আছে। এই সরকার দুই-তৃতীয়াংশ আসন এবং অর্ধেকের বেশি জনপ্রিয় ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।”
সরকারকে সেই প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য সময় দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মংলায় গুমের অভিযোগ যাচাই করবে সরকার
বাগেরহাটের মংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে এক যুবককে তুলে নেওয়ার পর তিন মাস ধরে নিখোঁজ থাকার অভিযোগ সম্পর্কে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার অভিযোগটি যাচাই করবে।
তিনি বলেন, “এই সরকার কোনও গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেবে না। অভিযোগটি যেহেতু এসেছে, তা যাচাই করতে হবে। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবো এবং তারা যেন বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়, সেই অনুরোধ করবো।”
কোনও ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে অপহরণ করে থাকলেও তাকে উদ্ধার এবং দায়ীদের শনাক্ত করার দায়িত্ব সরকারের বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, “কেউ অন্য পরিচয়ে কাজটি করলেও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নাগরিককে উদ্ধার করা এবং প্রকৃত ঘটনা বের করা সরকারের দায়িত্ব।”
নিজের মানবাধিকারভিত্তিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি কাউকে গুম বা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করে, তাহলে সেটি আর রাষ্ট্রীয় আচরণ থাকে না।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র বিচার করবে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আইন অনুযায়ী কারও মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু কাউকে ধরে গুম বা হত্যা করে ফেললে সেটি রাষ্ট্রের কাজ নয়, সেটি মাস্তানি।”
তথ্য কমিশন ও দুদক দ্রুত গঠনের আশ্বাস
তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে সরকারের অগ্রাধিকার দৃশ্যমান নয়— এমন অভিযোগের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যেই রয়েছে।
তিনি জানান, তথ্য কমিশন গঠনের জন্য আইন অনুযায়ী বাছাই কমিটি তৈরি হয়েছে এবং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, “তথ্য কমিশন খুব দ্রুত গঠন হবে। দুদক পুনর্গঠনের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে।”
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইন পরিবর্তনের কাজ চলায় কমিশন গঠনের আগে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
সিদ্ধান্তদাতা কর্মকর্তাদের বিচার হবে
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে গুলি চালানো পুলিশ সদস্যরা এখনও চাকরিতে রয়েছেন— এমন অভিযোগের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সব পর্যায়ের প্রত্যেক ব্যক্তিকে একসঙ্গে বিচারের আওতায় আনা বাস্তবসম্মত নয়। তবে যারা নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে ছিলেন, তাদের বিচার হবে।
তিনি বলেন, “বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিচারে সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও নির্দেশদাতা পর্যায়ের ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করা হয়।
“যারা নীতি গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত দেওয়ার জায়গায় ছিলেন, তাদের শুধু চাকরি থেকে বহিষ্কার নয়, বিচারও হবে।”
তবে অতীতের অপরাধের জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর বা অবিশ্বাসযোগ্য হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। আরও বলেন, “কারও অপরাধ থাকলে তার বিচার চলবে। কিন্তু পুলিশ বাহিনীকে কাজ করতে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী প্রয়োজন। অতীতের ব্যবহারের কারণে মানুষের মধ্যে যে ট্রমা রয়েছে, তা কাটাতে সময় লাগবে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনী ভালোভাবে কাজ করতে চাইলে জনগণ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতাও দরকার।”
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি নিশ্চিত করতে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
“আমরা বিষয়গুলো নিয়ে আন্তরিক। আইনজীবীদের প্যানেল গঠন করা হয়েছে। কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটি কেন ন্যায্য, আইনসম্মত ও জনস্বার্থে— তা জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করা হবে।”