রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা শেরেবাংলা নগর। যেখানে সরকারের বড় বড় দপ্তর আর ভিআইপিদের বাস। এই এলাকার সরকারি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যার কাঁধে, সেই নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মো. আন্দালিবের বিরুদ্ধেই উঠেছে দুর্নীতির ‘মহাসাগর’ তৈরির অভিযোগ। ভুয়া ভাউচার বানিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার এবং একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি কয়েক বছরে কামিয়ে নিয়েছেন অঢেল সম্পদ। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার অনিয়মের পাহাড় সমান তথ্য।
ডিপিএম পদ্ধতির অপব্যবহার ও ‘পছন্দের’ সিন্ডিকেট:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাদ মো. আন্দালিব শেরেবাংলা নগর বিভাগ-১ এ যোগদানের পর থেকেই সাধারণ ঠিকাদারদের জন্য দরজাও বন্ধ করে দিয়েছেন। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে তিনি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএম এর নগ্ন অপব্যবহার করছেন। নিয়ম অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে এই পদ্ধতি ব্যবহারের কথা থাকলেও, তিনি তার পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেই এটি ব্যবহার করেন। বিনিময়ে প্রতিটি কাজ থেকে তাকে মোটা অংকের কমিশন দিতে হয়। যারা কমিশন দিতে রাজি হন না, তাদের কপালে জোটে না কোনো কাজ। প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার মোস্তফা কামালের দুদকে দায়ের করা অভিযোগ, আন্দালিবের তৈরি করা এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।
অস্তিত্বহীন প্রকল্প ও ভুয়া বিলের হরিলুট :
আন্দালিবের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় খাত হলো ‘রক্ষণাবেক্ষণ’। শেরেবাংলা নগর এলাকায় বিভিন্ন সরকারি ভবনের সংস্কারের নামে তিনি শত শত ভুয়া ভাউচার তৈরি করেছেন। নথিপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, গত অর্থ বছরে তিনি কয়েক কোটি টাকা এভাবে কেবল কাগজ-কলমে কাজ দেখিয়ে পকেটস্থ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে একই দেয়ালে বারবার রং করা বা পুরনো টাইলস পাল্টানোর নামে ভুয়া বিল তোলা হয়েছে, যা স্রেফ সরকারি কোষাগারের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্থাপত্যের স্থায়িত্বে কুঠারাঘাত: নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার:
উন্নয়নমূলক কাজের নামে তিনি যে নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করছেন, তা অত্যন্ত নিম্নমানের। অভিযোগ উঠেছে, কমিশনের বিনিময়ে তিনি ঠিকাদারদের নিম্নমানের ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহারের মৌখিক অনুমতি দিয়ে দেন। এর ফলে সরকারি ভবনগুলোর স্থায়িত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে। নবনির্মিত অনেক ভবনের পলেস্তারা খসে পড়া কিংবা বর্ষায় ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। প্রকৌশলী হয়েও পেশাগত সততা বিসর্জন দিয়ে তিনি ভবনগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও চেইন অফ কমান্ড ধ্বংস :
আন্দালিবের এই দাপটের মূলে রয়েছে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব। বিগত সরকারের আমল থেকেই তিনি বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে একই স্থানে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে তিনি গণপূর্তের দাপ্তরিক ‘চেইন অফ কমান্ড’ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছেন। তার ক্ষমতার দাপটে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা কথা বলতে সাহস পান না। বদলি বা পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে তিনি অফিসের কর্মচারীদেরও তার অনৈতিক কাজে বাধ্য করেন বলে জানা গেছে।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়: নামে-বেনামে অঢেল বৈভব :
একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সাদ মো. আন্দালিবের জীবনযাপন রাজকীয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার বৈধ আয়ের সাথে জীবনযাত্রার কোনো মিল নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশে তার নামে এবং নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে তার বড় অংকের গোপন বিনিয়োগ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার এই বিপুল সম্পদের উৎস কী, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শেরেবাংলা নগর এলাকার সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা দাবি তুলেছেন, সরকারি কোষাগারের অর্থ রক্ষায় এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দুদকে অভিযোগকারী মোস্তফা কামাল জানান, আন্দালিবের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করলে অনেক থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে শেরেবাংলা নগরের সরকারি স্থাপনাগুলো আরও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
এ বিষয়ে সাদ মো. আন্দালিবের বক্তব্য নিতে তার দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং বিভাগীয়ভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া চলছে।