সোমবার ৯ মার্চ ২০২৬ ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২
 
শিরোনাম:


ভাষা সৈনিক ও প্রয়াত সাংবাদিক, প্রকাশক ও মুদ্রক গ্রেগরিয়ান তাজুল ইসলামের প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ৬:৫৭ পিএম   (ভিজিট : )
ভাষা সৈনিক ও প্রয়াত সাংবাদিক, প্রকাশক ও মুদ্রক গ্রেগরিয়ান তাজুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু কথা।

গ্রেগরিয়ান তাজুল ইসলাম 
জন্ম-১৩/০১/১৯৩৬ ইং
মৃত্যু-০২/০৩/১৯৯৫ ইং
গ্রেগরিয়ান -১৯৫২ ব্যাচ

রুচিশীল ও প্রগতিশীল প্রকাশণা জগতের অপু্র্ব শিল্পী তাজুল ইসলাম ১৯৩৬ সালের ১৩ ই জানুয়ারী কেরানীগঞ্জ থানার মান্দাইল নামক গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পর পরই তাঁর পিতা কর্মক্ষমতা হারান, যার ফলে খুব অল্প বয়সেই পিতা -মাতার একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অতি অল্প বয়সেই তাঁকে জীবন যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। তিনি অতি অল্প বয়সেই ছিলেন সজ্জন, নমনীয়, পরোপকারী। তাঁর আচার- আচরণে নিমিষেই তিনি সকলকে মুগ্ধ করে ফেলতেন নিমিষেই। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাজুল ইসলাম তাঁর পিতার সাথে আসামে চলে গিয়ে ছিলেন সেখানে তাঁর সাথে মার্কিন বিমান বাহিনীর কতিপয় অফিসারদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে, এই বালকের আচার - আচরণ ও তাঁর কথাবার্তায় উনারা   অভিভূত হয়ে ছিলেন যার ফলে তাঁরা তাঁকে  আমেরিকায় নিয়ে যেতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু তাজুল ইসলামের বাবা-মা তাঁদের একমাত্র সন্তানকে ছেড়ে দিতে রাজি হননি বলে তাঁকে মার্কিন বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজে তেজগাঁও বিমান বন্দরে অবতরণ করে তাঁকে তাঁরা তৎকালীন সময়ের পুরাতন ঢাকার লক্ষীবাজারস্হ ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরীজ উচ্চ বিদ্যালয়ে  ক্লাস থ্রী তে ভর্তি  করে দিয়ে যান। 

পরবর্তীতে তাজুল ইসলাম বিদ্যালয়ের এক আমেরিকান ব্রাদারের সান্নিধ্যে আসার পর ব্রাদার মেধাবী ছাত্র তাজুল ইসলামকে বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেন।তৎকালীন সময় বিদ্যলয়টির প্রধান শিক্ষক ছিলেন  ব্রাদার জুড সি,এস,সি। তিনি ১৯৫২ সালে সেন্ট গ্রেগরীজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন।এরপর তিনি কায়েদ-ই-আযম কলেজ অর্থাৎ বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচ,এস,সি ও জগন্নাথ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন  ডিগ্রী লাভ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ভাষা সৈনিক তাজুল ইসলাম ৫২'র ভাষা আন্দোলনে  সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। 

এ সময়ে তাজুল ইসলাম পুরাতন ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন ছাত্রসহ মিছিল নিয়ে  পশু হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাবার সময়  মিছিলের গতিরোধ করে  পুলিশ তাজুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন ছাত্রকে পুলিশ ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যায়, পরে তাদেরকে  ঢাকার বাইরে নিয়ে সারাদিন ঘুরিয়ে  টঙ্গীতে একটি নির্জন যায়গায় ছেড়ে দেয়।  

পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহই সাংবাদিকতা পেশাটি তাঁকে  অকৃষ্ট করে তুলেছিল।এই পেশায় থাকাকালীন তিনি মোহাম্মদ মোদাব্বের,নূর ইসলাম পাটোয়ারী, এহ্তেশাম হায়দার চৌধুরীর স্নেহের পাত্র ছিলেন। ১৯৫৫/৫৬ সালে তিনি মুকুল ফৌজের অর্থ সচিব নিযুক্ত হন।তিনি পটুয়া কামরুল হাসানের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। তিনি মিল্লাত ও অর্ধ সাপ্তাহিক পাকিস্তানের সম্পাদক ছিলেন। 

তিনি চয়েজ প্রিন্টিং নামে একটি ছাপাখানায় ফ্লাইং কাজ করতেন। সম্ভবত ১৯৬৪ সালে "বর্ণ মিছিলের"(সাহিত্য প্রকাশণা প্রতিষ্ঠান) গোড়াপত্তন হয়েছিল পুরানো ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের গলির ভিতরে ছোটো একটি ঘরে তাজুল ইসলাম সেখানে একজন মাত্র কম্পোজিটার  সাথে নিয়ে কাজ করতেন। ১৯৬৬ সালে কলতাবাজারের ৪২/এ,কাজী আব্দুর রউফ রোডের তাঁর নিজের বাসায় একটি ডিমাই মেশিন ও একজন মেশিনম্যান আর গোটা দুই কম্পোজিটার দিয়ে "বর্ণ মিছিল" নাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি প্রকাশনালয় যা পূর্ণ প্রকাশনায় আত্মপ্রকাশ করে ১৯৬৯সালে লক্ষীবাজারের ৭০,মিউনিসিপ্যাল ষ্ট্রীটে একটি  ছোটো ঘর নিয়ে। সেই লাইব্রেরীর সাজসজ্জা বা অঙ্গসজ্জা  করেছিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। 

প্রসঙ্গ: বই মেলা 

পৃথিবীর কোন দেশেই আমাদের দেশের একুশে বইমেলার মতো বই মেলা এতো দীর্ঘদিন ধরে চলে না। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ইউনেস্কো ১৯৭২ সালকে আন্তর্জাতিক গ্রন্থ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেন।গ্রন্থ মেলার উদ্যোক্তা ও সংগঠক সরদার জয়েন উদ্দিন বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে গ্রন্থ মেলার  আয়োজন করেন। এই মেলার পেছনে ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। মেলায় অংশ নিয়েছিল ইউনেস্কো, ঢাকায় অবস্থিত কয়েকটি দূতাবাস, ভারতীয় কয়েকজন প্রকাশক এবং ফরাসি দূতাবাসের আমন্ত্রণে এসেছিলেন বিশিষ্ট লেখক, অনুবাদক লোকনাথ ভট্টাচার্য। সেই থেকেই গ্রন্থ মেলার  সূচনা। ১৯৭২সালে,দেশ স্বাধীন হবার পর  বাংলা একাডেমীর একুশে অনুষ্ঠানে  কোন বই মেলা হয়নি। তবে বাংলা একাডেমীর দেয়ালের বাইরে ষ্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন, মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণ মিছিলের তাজুল ইসলাম ও বইয়ের দোকানের পসরা নিয়ে বসেন এভাবেই শুরু হয় বাংলা একাডেমীর বই মেলা। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে একটি বিশাল সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বই  মেলা উদ্বোধন করেন।  

এ উপলক্ষে  রুহুল আমিন নিজামী,মুক্তধারার  চিত্তরঞ্জন সাহা, বর্ণ মিছিলের তাজুল ইসলাম সহ আরো সাত আটজন  
প্রকাশক বাংলা একাডেমীর দেয়াল ঘেঁষে  বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে যান।সে বছরই প্রথম বাংলা একাডেমীর বই ও
বিক্রয় কেন্দ্রের বাইরে একটি ষ্টলে বিক্রি করা হয়। তাজুল ইসলাম একবার বিচিত্রায় প্রকাশণা ব্যবসার তিক্ত অভিজ্ঞতা  
সম্পর্কে বলেছিলেন যে, "চতুর্দিকে সংকট আছে তবু এই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে এই পেশায় লেগে থাকতে চাই। হয়তো  জাগতিক লাভ হবে না, কিন্তু সু- গ্রন্থ পাঠকদের উপহার দিয়ে একটা আনন্দ তো আছে।" 

তাজুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে মোঃ মোদাব্বেরের "সাংবাদিকের রোজনামচা",আনোয়ার পাশার "রাইফেল- রোটি -আওরাত "( মুক্তিযুদ্ধ  ভিত্তিক একটি লেখা যা তৎকালীন সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য পুস্তকের অন্তর্ভূক্ত করেন  ), সরদার ফজলুল করিমের "প্লেটোর রিপাব্লিক", আব্দুল হাই এর "ধ্বনি বিজ্ঞান ওধ্বনি তত্ত্ব ", আহম্মদ শরীফের" বাঙ্গালী সাহিত্য ", আরজ আলী মাতব্বরের "সত্যের সন্ধানে", আল মাহমুদের "পানকৌড়ির রক্ত ", আলী ইমামের" দ্বীপের নাম মধুবুনিয়া", সরদার ফজলুল করিমের "নানা কথা",আব্দুল কাদিরের "আবুল হোসেনের রচনাবলী",আরজ আলী মাতব্বরের "সৃষ্টি রহস্য ",মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও আনোয়ার পাশার চর্যাগীতিকা ",করুণাময় "গোস্বামীর কিশোর সঙ্গীত ",দিলারা হাসেমের  "স্তব্ধতার কানে কানে ",শাহরিয়ার কবিরের "হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা " সহ আরো অনেক অনেক সাহিত্য সমাদৃত হয়েছে।       

শিশু - কিশোরদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারনে নিজ অর্থ্যানূকুল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় তাজুল ইসলাম সত্তরের দশকে  প্রতিষ্ঠা করে গেছেন  পাঁপড়ি শিল্পী গোষ্ঠী। আশির দশকে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল  বাংলাদেশের বরেণ্য এই সাংবাদিক, মুদ্রক ও প্রকাশক তাজুল ইসলামের একান্ত সান্নিধ্যে আসার তাই  আমি আজও নিজেকে ধন্য মনে করি।
১৯৯৫ সালে যাদুঘর মিলনায়তনে তাজুল ইসলাম সাহেবের "স্মরণ সভায় "অবশ্য তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথাই উচ্চারিত হয়েছে, এই যে আজকের একুশের বই মেলা এতো জাঁকজমক ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, এই বইমেলার প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন  "বর্ণ মিছিলের" তাজুল ইসলাম। ছোট একটি টেবিল কালো রংয়ের একটি ট্রাঙ্কে করে বেশ কিছু বই নিয়েই তিনি ১৯৭৩ সনে বই মেলার প্রবর্তন করেন।তাজুল ইসলামের "স্মরণ সভায় "অবশ্য কেউ কেউ ইতিহাসের নিরিখে মূল্যায়নের কথা বলেছেন, কেউ আবার তাগিদ দিয়েছেন আগামী প্রজন্মের জন্য তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে... ভাগ্যের নির্মম পরিহাস..  তারপর বহুদিন কেটে গেছে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার কোনটাই আর হয়নি।








আরও খবর


 সর্বশেষ সংবাদ

৩৭ হাজার ৫৬৭ নারী প্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা দেওয়া হবে: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী
পারস্পরিক সংস্কৃতির বিনিময় মানুষে-মানুষে সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে: সংস্কৃতি মন্ত্রী
ঈদের সিনেমার ট্রেলারের চেয়েও আমার কনটেন্ট বেশি সাড়া পাচ্ছে: জায়েদ খান
বাংলাদেশ থেকে মব সংস্কৃতি নির্মূল করা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজার পদত্যাগ
আরো খবর ⇒


 সর্বাধিক পঠিত

কুড়িগ্রামে ওহী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সবক ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত
‎সালথায় পেঁয়াজ বিক্রি করেই লোকসান গুনছেন কৃষকগণ, ‎উৎপাদন খরচ পাচ্ছেনা
চার জেলার স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে শেরপুর সদর হাসপাতাল
সাভারে ৩দিনব্যাপী যুব উদ্যোক্তা মেলার শুভ উদ্বোধন
দালাল ধরতে রাজধানীর তিন হাসপাতালে র‍্যাবের বিশেষ অভিযান
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: spnewsdesh@gmail.com