বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমাকে কেন্দ্র করে ‘নীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বপ্ন এক দশক আগে থেকে দেশের মানুষকে দেখানো হচ্ছিল, মৎস্য অধিদপ্তরের ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পটি সেই স্বপ্নের সমাধিস্থলে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই উচ্চাকাক্সক্ষী উদ্যোগটির সবচেয়ে হতাশাজনক অধ্যায় হলো-সাড়ে সাত বছর অতিবাহিত হলেও নির্ধারিত বাজেটের বিশাল একটি অংশ খরচ করতে পারেনি মৎস্য অধিদপ্তর। ফলে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতির হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন তহবিল এখন বিদেশে অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের কাছেই ফেরত যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির এই অপূরণীয় ক্ষতিকে কর্তৃপক্ষ ‘দক্ষ ব্যবস্থাপনা’ ও ‘সাশ্রয়’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে এটি চরম প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অদূরদর্শিতারই বহিঃপ্রকাশ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের নথিপত্র এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এক নিদারুণ চিত্র ফুটে ওঠে। ১৮টি আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা ছিল এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি, যা মাছের গুণমান রক্ষা ও বিদেশে রপ্তানির জন্য ছিল অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরেও মৎস্য অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবী করছে প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগিরা। কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, জমির মালিকানা জটিলতা এবং নির্ধারিত জমি অন্য সংস্থাকে দিয়ে দেওয়ায় তারা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারেনি। তবে সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো কার্যকর সমীক্ষা বা ভূমি নিশ্চয়তা ছাড়াই কেন এমন বিশাল বাজেটের প্রকল্প হাতে নেওয়া হলো এবং কেন দীর্ঘ সময় ধরে এর সমাধান করা সম্ভব হলো না? জমি না পাওয়ায় ১৬টি সার্ভিল্যান্স চেকপোস্টের জায়গায় হয়েছে মাত্র ৫টি এবং ১৬টি ফিশারিজ পন্টুনের জায়গায় মাত্র ৬টি নির্মিত হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণে এই বিশাল ব্যর্থতা প্রকল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের টাকা অব্যবহৃত থেকে ফেরত যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দাবি উঠেছে প্রকল্পের টাকা ফেরত যাওয়া নিয়ে, যা সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে উপহাস করার শামিল। যেখানে উপকূলীয় লাখ লাখ জেলে আধুনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সেখানে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী ৯৭ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। তাদের মতে, ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন এবং কোভিডের কারণে বিদেশ ভ্রমণ বাতিল হওয়ায় যে টাকা বেঁচেছে, তা আসলে ‘সাশ্রয়’। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নির্ধারিত টেন্ডারগুলোতে রেসপনসিভ দরদাতা না পাওয়া এবং কাজ শুরু করতে না পারার কারণেই এই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। একটি উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করে হাজার কোটি টাকা বিদেশে ফেরত পাঠিয়ে তাকে ‘সাশ্রয়’ হিসেবে দাবি করা প্রশাসনিক চরম দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কিছুই নয় এমনটাই মন্তব্য মৎস বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার।
প্রকল্পের স্থবিরতার পেছনে বারবার প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন হওয়াকে কর্তৃপক্ষ ‘নিয়মিত প্রক্রিয়া’ বললেও এটি মূলত সমন্বয়হীনতারই নামান্তর। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো-সরকারের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও ৮টি টহল বোট (প্যাট্রোল বোট) ক্রয় করতে না পারা। কর্তৃপক্ষ বলছে, জিওবি অংশে সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় এগুলো কেনা যায়নি। কিন্তু সমুদ্রসীমায় নজরদারির জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই সরঞ্জামগুলো কিনতে না পারার অর্থ হলো গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারা। এটি কেবল প্রকল্পের টাকা ফেরত যাওয়া নয়, বরং দেশের সম্পদ রক্ষার সুযোগ হারানো।
মাঠ পর্যায়ের হাহাকার কর্তৃপক্ষের এই ‘সাফল্যের’ দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে অনেকে। খুলনার পাইকগাছা থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত জেলেরা আজও সেই পুরনো ভাঙা ঘাটেই মাছ নামাতে বাধ্য হচ্ছে। বরগুনার পাথরঘাটার খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে আছে, যা প্রকল্পের অধীনে খনন করার কথা ছিল। জেলেরা বলছেন, সরকার তাদের নাম-ধাম লিখে নিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো সুযোগ-সুবিধার ছোঁয়া তাদের দ্বারে পৌঁছায়নি। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যর্থতা এবং নিজেদের অদক্ষতাকে বিশ্ব পরিস্থিতি বা কোভিডের দোহাই দিয়ে ঢাকার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের উপকূলীয় অর্থনীতিকে। যে টাকা দিয়ে উপকূলের মানুষের জীবন বদলানো যেত, সেই হাজার কোটি টাকা আজ স্রেফ কাজের অভাবে বিদেশে ফেরত যাচ্ছে-যা নীল অর্থনীতির সোনালী স্বপ্নকে এক ধূসর মরুভূমিতে পরিণত করেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের বেহাল দশা এবং ব্যর্থতার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবিগুলো নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো:
জমি ও অবকাঠামো প্রসঙ্গে: “প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান ফিশ ল্যান্ডিং এবং পোস্ট হার্ভেস্ট সার্ভিস সেন্টার উন্নয়ন নির্ধারিত ছিল। বিদ্যমান ব্যবহারকারীগণের নিকট হতে অনাপত্তি পাওয়া গেলেও অবকাঠামো নির্মাণের পূর্বে মালিকানা বিষয়ে জটিলতা দেখা দেয়, যা প্রকল্প কর্তৃক সমাধান সম্ভব ছিল না, এর সাথে অধিগ্রহণের বিষয় সম্পৃক্ত নেই। ব্রুড ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের জন্য নির্ধারিত জমি সরকার অন্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করায় এবং নতুন জমি বরাদ্দ না পাওয়ায় সেটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি; পরবর্তীতে ডিপিপি সংশোধনের সময় কার্যক্রমটি বাদ দেওয়া হয়।”
অর্থ ফেরত ও সাশ্রয় প্রসঙ্গে: “প্রকল্পে বরাদ্দের ৬০ শতাংশ খরচ হয়নি-এমন তথ্য সঠিক নয়। সংশোধিত উচচ অনুযায়ী ৯৭ শতাংশের বেশি অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের কোনো অর্থ ‘অব্যবহৃত’ থাকার কারণে ফেরত দেয়া হয়নি। যে পরিমাণ প্রাক্কলিত বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে, তা মূলত ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন, কোভিড-১৯ এর কারণে বিদেশ প্রশিক্ষণ বাতিল, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে কম মূল্য পাওয়া এবং কিছু অবকাঠামো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রেসপনসিভ দরদাতা না পাওয়ায় ২টি প্যাকেজ বাদ দেওয়ার কারণে।”
নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে: “প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন সরকারি ব্যবস্থাপনার নিয়মিত প্রক্রিয়া যা কার্যক্রমকে স্থবির করেনি। জিওবি অংশে সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় ৮টি প্যাট্রোল বোট ক্রয় করা যায়নি, যা পরবর্তীতে ডিপিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৌশলগত স্থানে জায়গা না পাওয়ায় ১১টি সার্ভিল্যান্স চেকপোস্টের পরিকল্পনাও বাদ দিতে হয়েছে যা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না।”
নৌযান ট্র্যাকিং ও নিবন্ধন প্রসঙ্গে: “৩০ হাজার নৌযানের মধ্যে ৮৫০০টিতে জিএসএম ডিভাইস ব্যবহার করে ট্র্যাকিং পাইলটিং করা হয়েছে এবং কোন ধরনের ডিভাইস উপযোগী তা মৎস্য অধিদপ্তরে দাখিল করা হয়েছে। তবে মৎস্য নৌযান নিবন্ধন প্রকল্পের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, বিধায় এ বিষয়ে প্রকল্পের কোনো বক্তব্য নেই।”