দুর্বল ব্যাংকগুলোর টাকা ফেরত দিলে উপকৃত হবে সাধারণ গ্রাহক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র
রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড আবাসন, বাণিজ্যিক প্রকল্প, প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট, হোটেল ও লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছে রূপায়ন গ্রুপের অন্যতম এ প্রতিষ্ঠানটি।
তবে আবাসন খাতে নেতৃত্ব দেয়া এই কোম্পানিটির কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এরমধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ। খেলাপি ঋণের মধ্যে দেশের ৬ দুর্বল ব্যাংকের রয়েছে ৬০০ কোটি টাকা প্রায়। অথচ টাকার অভাবে এ ব্যাংকগুলো তার গ্রাহকদের এক লাখ টাকার বেশি দিতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ একটি অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
একসময় দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসেবে খ্যাতি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংকের। ব্যাংকটি শিকদার গ্রুপের অধীনস্ত হওয়ার পরেই দুর্বল ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। এখন এমন অবস্থায় রয়েছে ব্যাংকটি যেখানে তার গ্রাহকদের এক লাখ টাকাও দিতে পারছে না। ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে রূপায়ন হাউজিংয়ের খেলাপি ৭৩ কোটি টাকা। এই টাকা ফেরত পেতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিলেও টাকা ফেরত পাওয়া হয়নি ন্যাশনাল ব্যাংকের।
এছাড়া আরও ৫টি দুর্বল ব্যাংকের ৫১৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি রূপায়ন হাউজিং। এরমধ্যে এমন ব্যাংকও রয়েছে যারা ব্যাংক হিসেবেই আর থাকছে না। অন্য আরও কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি ব্যাংকে রূপ নিচ্ছে।
এমন ব্যাংকগুলো হলো সোশ্যাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক খাতের লুটেরা এস আলমের ভয়াল থাবায় এ ব্যাংক দুটি হারিয়েছে তাদের মূলধন। এসব ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকরা হারিয়েছেন তাদের সম্বল। এস আলমের পাশাপাশি এ ব্যাংক দুটির টাকা নিয়েও ফেরত দিচ্ছে না রূপায়ন হাউজিং। তথ্যমতে, সোশ্যাল ইসলামীর কাছে ৮৯ কোটি ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামীর কাছে ১৭৮ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হামিদুল ইসলাম। চাকরি জীবনের শেষ সম্বল পেনশনের ১৮ লাখ টাকা রেখেছিলেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। শেষ বয়সে এসে সুদের সাথে জড়াবেন না ভেবে রেখেছিলেন ইসলামী ধারার এ ব্যাংকটিতে। আমানতের বিপরীতে ভালো মুনাফার প্রস্তাব পেয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ সালে। এরপর করোনার ভয়াবহ সময়েও হাত দেননি ব্যাংকের টাকায়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যূত্থানের পর ব্যাংকখাতের আসল চিত্র বের হওয়া শুরু করলে দুশ্চিন্তায় পড়েন নিজের আমানত নিয়ে। এরপর টাকা তুলতে চাইলেও পারেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের আশ্বাসে অপেক্ষা করেন এক বছর।
চলতি বছর ২০২৫ সালে নিজের সবচেয়ে ছোটো মেয়ের বিয়েতে খরচ করার জন্য টাকা তুলতে যান ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে। হামিদুল ইসলামের রাখা ১৮ লাখ টাকা তো দিতে পারেইনি ব্যাংক, মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে দেয় বলে জানা যায়। অথচ রূপায়ন হাউজিং ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ শোধ করলেও এমন অনেক গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারতো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বলে জানান ব্যাংকটির সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এমন অনেক গ্রাহক আমাদের আছে যারা ব্যাংকের থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে ওষুধ, চিকিৎসা খরচ নির্বাহ করেন। অথচ তাদের চরম দুঃসময়ে আমরা ব্যাংক থেকে টাকা ফেরত দিতে পারিনি। রূপায়ন হাউজিংকে বারবার তাড়া দিয়েও টাকা ফেরত পাইনি আমরা। গণঅভ্যূত্থানের পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছি। রূপায়ন বিভিন্নভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ম্যানেজ করে আমাদেরকে মামলা করা থেকে বিরত রেখেছে। তারা যদি টাকা ফেরত দিত এমন অনেক গ্রাহককে আমরা টাকা দিতে পারতাম যারা চিকিৎসা, সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এমনকি নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে পারতো। একজন গ্রাহক যদি প্রয়োজনের সময় তার টাকা ফেরত না পান ব্যাংক থেকে, তবে ব্যাংকের উপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে। এর প্রভাব শুধু খারাপ ব্যাংকগুলোর উপরেই পড়বে না, ভালো ব্যাংকগুলোও এ অবিশ্বাসের শিকার হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রূপায়ন গ্রুপের কাছে টাকা ফেরতে কয়েকটি নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু ৫ আগস্টের আগে (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) বিভিন্ন উপায়ে এড়িয়ে যেত। গণঅভ্যূত্থানের পরে আমরা আশা করেছিলাম তারা এবার টাকা ফেরত দিবে। কিন্তু তাও কোনো অগ্রগতি হয়নি খেলাপি ঋণের। অথচ গ্রুপটি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের স্পন্সর হয়ে কোটি টাকা খরচ করেছে। এই টাকাগুলোও যদি ব্যাংক পেত তবে তার গ্রাহকদের দিতে পারতো।’
এদিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকও একত্রিত হয়ে যাচ্ছে মূলধন হারিয়ে। সেই ব্যাংকটিরও ৮৯ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না রূপায়ন হাউজিং। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার নোটিশ দেওয়া হলেও রূপায়ন কোনো টাকা ফেরত দেয়নি বলে জানান সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, রূপায়ন হাউজিংয়ের সর্বোচ্চ ঋণ সাউথইস্ট ব্যাংকের কাছে। এ ব্যাংকটির সাথে রূপায়ন গ্রুপের বিশেষ একটি সখ্যতা রয়েছে বলে জানা যায়। সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান দূর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে বহিস্কৃত হয়েছেন। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ সখ্যতার সাহায্যে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় রূপায়ন হাউজিং। যার মধ্যে ৭০৯ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে।
ব্যাংকটির একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের অনেক অন্যায়ের পার্টনার রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান। তারা মিলেমিশে ব্যাংকের লোন বাগিয়েছে।’
এছাড়া রূপায়ন হাউজিংয়ের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা ৮৭ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের ৭৩ কোটি, ইউসিবি ব্যাংকের ৪৭ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ১৫৩ কোটি, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের ১১২ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ১৭০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়েছে রূপায়ন হাউজিং। এসব ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউসিবি, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ও এনআরবি ব্যাংক দূর্বল ব্যাংক হিসেবে পরিচিত।
এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হয় রূপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুলের সঙ্গে। তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে মেসেজ দিলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।
পরবর্তীতে গ্রুপটির পক্ষ থেকে হাবিবুর রহমান পলাশ বলেন, ‘আমাদের গ্রুপ ঋণ নিয়েছে। তবে এ ঋণ আমরা দেশেই ব্যবসাখাতে বিনিয়োগ করেছি। আমরা কোনো টাকা পাচার করিনি। কিছু ঋণ খেলাপি হয়েছে। এরমধ্যে কিছু টাকা আমরা ফেরতও দিয়েছি।’
রূপায়ন হাউজিংয়ের টাকা ফেরত না দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেইন খান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর প্রতি আমাদের বিশেষ নির্দেশনা আছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি তাদের অ্যাসেট কোয়ালিটি নষ্ট হয়েছে। তাদের অ্যাসেট উদ্ধারে তাদেরকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে যা যা করণীয় ব্যাংকগুলো তাই করবে। মামলা করা লাগলে সেটাও করতে হবে। শুধু মামলা করলেই হবে না, অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ এবং মামলার নিয়মিত তদারকি করতে হবে। কোনো গ্রুপ ব্যাংকের টাকা নিয়ে টাকা ফেরত দিবে না; ঋণগ্রহীতার পক্ষে যায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত তফসিলি ব্যাংকগুলোকে চাপিয়ে দেয় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’