কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী আক্তারুজ্জামানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে ঘুষ, অনিয়ম ও নারী কেলেঙ্কারির যে অভিযোগগুলি প্রচারিত হয়েছে, তা এখন শহরের আলোচিত বিষয়। তবে অভিযোগের ঝড় উঠলেও এর ভিত্তি, সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে মাঠে নেমে দেখা গেলো সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমান সহকারী পদে দায়িত্ব পালন করা আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ হয়েছিল। তদন্ত শেষে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, যার স্মারক নং—০০০১০০০০ ৬০০,৭০.১২৮.২২.১৫৮ নথিভুক্ত রয়েছে। তাই নতুন করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। অনুসন্ধানে হাসপাতালের বিভিন্ন স্টাফ, নার্স, কর্মকর্তা ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো—অভিযোগের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অন্য গল্প। অনেকেই জানান, আক্তারুজ্জামান শান্তস্বভাবের, ভদ্র, কর্মনিষ্ঠ এবং সবসময় দায়িত্বে নিবেদিত একজন মানুষ। নার্সদের কাছে ঘুষ নেওয়ার যে অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়া ঘুরছে, বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং নার্সদের বেশ কয়েকজন সরাসরি বলেন, তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ কখনো ঘটেনি; বরং প্রয়োজন হলে তিনি সহযোগিতা নিশ্চিত করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নার্স শামিমা (ছদ্মনাম) জানান, একটি অসাধু চক্র আক্তারুজ্জামানকে টার্গেট করে বিভিন্ন নার্সকে অভিযোগ করতে চাপ দিচ্ছে, কারণ তারা তাকে পদ থেকে সরিয়ে অন্য কাউকে বসিয়ে সুবিধা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তিনি চক্রটির নাম প্রকাশ করতে ভয় পান।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়—হাসপাতালের বেতন ব্যবস্থাপনায় উচ্চমান সহকারীর ক্ষমতা সীমিত। ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন শিট কর্তৃপক্ষ তৈরি করে, আর ১ম ও ২য় শ্রেণির কর্মচারীরা নিজেদের বেতন শিট নিজেরাই প্রস্তুত করেন। ফলে বেতন–সংক্রান্ত অনিয়মে আক্তারুজ্জামানকে জড়ানোর ধারণা হাসপাতালের অনেক স্টাফই অস্বীকার করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসা আরেকটি অভিযোগ—তিনি নাকি গভীর রাতে হাসপাতালে অবস্থান করেন। তদন্তে জানা যায়, তার পদের স্বভাবগত কাজ—নথিপত্র, কাগজপত্র, আইনি রিপোর্ট তৈরির কারণে তাকে প্রায়ই দেরি পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয়। আবার তিনি দীর্ঘদিন কুড়িগ্রামে চাকরি করায় স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্কও তৈরি হয়েছে, ফলে কেউ অসুস্থ হলেই তাঁকে ডাকেন। এই মানবিক যাতায়াতকেও এখন কেউ কেউ অভিযোগে পরিণত করছেন।
কুড়িগ্রামে দায়িত্ব পালনরত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা জানান,আক্তারুজ্জামান সবসময় সহযোগিতাপ্রবণ। বিভিন্ন তদন্ত বা সরকারি প্রক্রিয়ায় তার সহায়তা প্রয়োজন হলে তিনি নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে নারী কেলেঙ্কারির বিষয়ে তার সহধর্মিণী দৃঢ়ভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যাকে কেন্দ্র করে এসব অপবাদ ছড়ানো হয়েছে তার পরিবারের সঙ্গে তাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি এসবকে সম্পূর্ণ চক্রান্ত দাবি করে বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন অপবাদ প্রচার করা আইনের আওতায় দণ্ডনীয়।
রোগীর অনেক অভিভাবকও জানান, আক্তারুজ্জামান বহুবার রাতে হাসপাতালে দাঁড়িয়ে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি কখনও ফাঁকি দেন না; বরং হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সময়ে সামনে এসে দাঁড়ান। অথচ এত বছরের সেবার পর আজ তাকে অপপ্রচারের শিকার হতে হচ্ছে, যা অনেকের কাছে ‘গুজব ও পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা’ ছাড়া কিছুই নয়।
অভিযুক্ত আক্তারুজ্জামান বলেন, তাকে না জানিয়ে, তার বক্তব্য না নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে—যা তার সম্মানহানি করেছে এবং সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তিনি জানান, তিনি আইনকে শ্রদ্ধা করেন এবং এই চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবেন।
কুড়িগ্রামের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রচার করা সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় স্পষ্ট অপরাধ। এতে মানসিক চাপ, হতাশা এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও তৈরি হতে পারে। তাই তারা প্রশাসনের প্রতি অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান। কুড়িগ্রামের বেশ কিছু আইনজীবীর মতে—মানহানি, মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ—এসবের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৯৯–৫০০, ৫০৫ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের একাধিক ধারা ব্যবহার করা যায়। তাদের দাবি, তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও আক্তারুজ্জামানের যে সামাজিক ক্ষতি হয়েছে—তার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—যে মানুষটি দায়িত্ব পালন করে বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেই আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হলো, তার প্রকৃত বিচার কি তিনি পাবেন? সত্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে আজ কুড়িগ্রামের মানুষের একটাই প্রত্যাশা—অভিযোগের বিচার যেমন হওয়া উচিত, অপপ্রচারের বিচারও যেন সমান জোরালোভাবে হয়।