
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে রাশিয়ার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সাখালিন-২ প্রকল্প ও পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকেও গ্যাস আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তসরকার কমিশনের (আইজিসি) বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাবিষয়ক পঞ্চম সভায় জ্বালানি খাতের এসব সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ইউরোপ উইংয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। অন্যদিকে রাশিয়ার ফেডারেল এজেন্সি ফর ফিশারিজের প্রধান এবং কমিশনের রুশ অংশের চেয়ারম্যান ইলিয়া শেস্তাকভের নেতৃত্বে দেশটির একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।
সভায় রাশিয়ার জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম জানায়, বাংলাদেশ আগ্রহী হলে সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও সাখালিন এনার্জির মধ্যে সরাসরি আলোচনা এগিয়ে নিতে তারা সহায়তা করতে প্রস্তুত। এ ছাড়া উস্ট-লুগা প্ল্যান্ট থেকে এলএনজি সরবরাহ এবং পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনাও তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। এ লক্ষ্যে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং ডিজিটাল আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন পরিচালনায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায় মস্কো। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি পরিশোধে সৃষ্ট জটিলতাও এ উদ্যোগের অন্যতম কারণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন, জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত আরেক কর্মকর্তা জানান, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে রুশ প্রতিনিধিরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ বিষয়ে মস্কোর আগ্রহ বেড়েছে।
এর আগে বাংলাদেশে রুশ ব্যাংকের শাখা স্থাপন, ভারতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি এবং দুই দেশের মধ্যে পৃথক পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। এবারের আলোচনাতেও বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ইআরডির নথি অনুযায়ী, রুশ এক্সপোর্ট সেন্টার গ্রুপের আওতাধীন এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায়। দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি-রপ্তানির অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ জন্য বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে রুশ পক্ষ। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকে রাখা অর্থ নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট রুশ ব্যাংকে পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধের বিষয়টিও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়ার প্রস্তাবিত এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া ও এর মূল প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টার—দুটিই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি পরিশোধসংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।
জ্বালানি খাতে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। রাশিয়ার অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই দেশের অংশীদারত্বের অন্যতম বড় প্রকল্প।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য দুই দেশের মধ্যে স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে যুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভোলায় একাধিক কূপ খনন করেছে। ২০২৩ সালে সেখানে আরও পাঁচটি কূপ অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করে গ্যাজপ্রম ইন্টারন্যাশনাল।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে গম ও পটাশ সার আমদানিতে দেশটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীদের একটি। এবারের সভার কার্যপত্রে সার সরবরাহ বাড়ানো এবং কৃষি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শিল্প ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়নে আর্থিক এবং অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করতে চায় রাশিয়া। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন করপোরেশন ভিইবি.আরএফ (VEB.RF) এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বৈঠকের কার্যপত্রে।
এ ছাড়া দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্ভাবনাময় প্রকল্পের তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে শুল্কসংক্রান্ত সহযোগিতাও বাড়াতে চায় উভয় দেশ। এ জন্য শুল্কবিষয়ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে দুই পক্ষ। এর মধ্যে রাশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বরাদ্দ, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়গুলো রয়েছে।