প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) নামের এ উদ্যোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে পোশাক, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহ করা হবে।
পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কর্মসূচিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির মোট অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে শিক্ষার্থীদের সহায়তা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে।
এর মধ্যে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের পোশাক, জুতা, মোজা ও ব্যাগ কেনার জন্য। এ সুবিধা পাবে মোট ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নেওয়া হয়েছে ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ উদ্যোগ। এ খাতে মোট কর্মসূচির ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আওতায় শিক্ষকদের হাতে পৌঁছাবে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫১৩টি ট্যাব। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে বসানো হবে ২০ হাজার ইন্টার্যাক্টিভ ফ্ল্যাট প্যানেল (আইএফপি) ও প্রজেক্টর। এর মাধ্যমে পাঠদানকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভৌত পরিবেশের উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হবে। মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ রাখা হয়েছে এ খাতে।
প্রয়োজন বিবেচনায় ১৫ হাজার ৬৪১টি নতুন শ্রেণিকক্ষ, দেড় হাজার ওয়াশ ব্লক এবং ১০ হাজার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিশুদের ভাষা ও গণিতের প্রাথমিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট ব্যয়ের ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আওতায় ৩ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রশিক্ষণ পাবেন। প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব পাবে ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরেসি (এফএলএন), অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া ও গণনার সক্ষমতা অর্জন।
পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে বিদেশি ঋণ ও অনুদান হিসেবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কর্মসূচিটির অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার পাওয়া গেছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে বেনিফিট-কস্ট রেশিও বা সুবিধা-ব্যয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে উদ্যোগটি ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে একই একনেক সভায় ৫৮ হাজার ৮৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের মোট ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ১১টি, সংশোধিত দুটি।
সভায় দেশের ৬৩৯টি থানার যানবাহন সংকট মোকাবেলায় পুলিশকে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের থানাগুলোতে গড়ে দুটি গাড়িও নেই।
গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া প্রকল্প দুটির একটিতে ৪ হাজার ৮২৯টি সাধারণ যানবাহন সংগ্রহে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অন্যটির আওতায় কেনা হবে ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যান। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ২ হাজার ২৮০ কোটি ১০ লাখ টাকা।