শুক্রবার ● ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ● ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


ঢাকার ফুটপাতে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ, জিম্মি পথচারীরা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম  (ভিজিট : ১১)
রাজধানীর ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে হকারদের ব্যবসা। আর এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে চাঁদা আদায়ের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ফুটপাত থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এতে একদিকে যেমন পথচারীদের চলাচলের অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি বড় চক্র টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।

ঢাকার গুলিস্তান, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলের চিত্র স্পষ্ট। কোথাও টেবিল, কোথাও চৌকি, আবার কোথাও ভ্যান বসিয়ে চলছে বেচাকেনা। এসব জায়গায় ব্যবসা করতে হকারদের নিয়মিত টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দোকানের আকার, অবস্থান ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণ ১০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার নামেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের হিসাবে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় নিয়মিত হকারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। ঈদকে কেন্দ্র করে মৌসুমি হকার যুক্ত হলে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়ায়। হকারপ্রতি দৈনিক গড়ে ৩০০ টাকা করে আদায় করা হলে প্রতিদিন চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে বছরে এই অঙ্ক প্রায় ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সমান।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় ঢাকার ফুটপাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের হিসাব উঠে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে হকার সংগঠনগুলোর হিসাবে এই অঙ্ক বেড়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে এটি হকার সংগঠনের দেওয়া হিসাব; হকারের সংখ্যা ও আদায়ের পরিমাণ নিয়ে হালনাগাদ স্বাধীন জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি। 

চাঁদা আদায়ের নেপথ্যে কারা?

হকারদের অভিযোগ, ফুটপাতের জায়গা নিয়ন্ত্রণ, দোকান বসানোর অনুমতি এবং প্রতিদিনের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। মাঠপর্যায়ে লাইনম্যান বা নিয়ন্ত্রণকারীরা হকারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। অভিযোগ রয়েছে, আদায় করা অর্থের একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের কাছে পৌঁছে যায়।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও গবেষণায় চাঁদার অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারার অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও লাইনম্যানদের মধ্যে অর্থ ভাগ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্টভাবে ৩০, ৪০ ও ৩০ শতাংশ ভাগের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে এই হিসাবকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। 

এদিকে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। অভিযানের পর আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসেন হকাররা। এতে একদিকে পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকছে।

সমাধানে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই রাজধানীর হকারদের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা ও তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। নিবন্ধিত হকারদের পরিচয়পত্র ও নির্দিষ্ট ব্যবসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। সরকার নির্ধারিত ফি থাকলে তা সরাসরি সরকারি তহবিলে জমা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অবৈধ চাঁদাবাজির সুযোগ কমে।

একই সঙ্গে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রকে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ফুটপাতের জায়গা ও জনচলাচলের চাপ বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। জনবহুল ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রেখে বিকল্প স্থানে বা নির্দিষ্ট সময়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হকার্স মার্কেট বা নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পুলিশ, নাগরিক প্রতিনিধি ও হকার সংগঠনের সমন্বয়ে তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের পর একই জায়গায় যেন আবার অবৈধ দখল গড়ে না ওঠে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি জরুরি।

ফুটপাত শুধু হকারদের ব্যবসার জায়গা নয়, এটি নগরবাসীর চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: মাহফুজুর রহমান রিমন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]