রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে পুলিশ প্রহরায় ধ্বংসযজ্ঞ ভবনে চলছে টিকাদান কার্যক্রম। ছোট্ট শিশুদের সঙ্গে নিয়ে টিকা দিচ্ছেন অভিভাবকরা।
ভাঙচুর ও লুটপাটে কিছুই অবশিষ্ট না থাকা প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা এদিন ভাঙা ভবনের মধ্যে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেছিলেন স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শ ও টিকাদান কার্যক্রমে। অন্যান্য দিনের মতো সোমবারও সেখানে ছিল স্থানীয় নিম্ন ও মধ্যবিক্ত মানুষের ভিড়। ধ্বংসযজ্ঞ ভবনে বিদ্যুৎবিহীন গরমে অতিষ্ঠ শিশু, অভিভাবক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
স্বাস্থ্যসেবাকর্মী বলছেন, এভাবে টিকা দেওয়া কষ্টের, তবুও যথাসময়ে যেন শিশুরা টিকা পায় সেজন্য ভাঙা ভবনের মাঝেও টিকা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শিশুসহ সবার কষ্ট হচ্ছে।
নাতনিকে টিকা দিতে নিয়ে আসা আফসানা শারমিন নামের একজন জানান, টিকা দেওয়ার তো একটা তারিখ থাকে। এইখানে প্রথম থেইকা টিকা দিছি। এখন এইখানেই নিয়া আসছি। কষ্ট হইলেও টিকা দিতেছে। যদি তারা টিকা না দিত তাইলে আমরা কই যাইতাম?
মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, যা সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ৫০ বছর ধরে গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। হামলাকারীরা জমিটির সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেডের’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে চলে যান।
দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন আফরোজা নাজনীন নামের একজন মা। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, হামের টিকা দিতে এসেছি। ভাঙচুর করা বিল্ডিংয়ে টিকা চলছে। কারেন্ট না থাকায় এখানে গরম। ভিড়ও বেশি।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমিত পরিসরের সেবা নিতে আসা অনেকেই শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তবে প্রত্যেকেই অপেক্ষা করে সেবা নিয়ে ফিরেছেন। মূল ফটকে একটি বেঞ্চে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন পুলিশ সদস্য, এছাড়া ভবনের ভেতরে এপিবিএন সদস্যদের দেখা যায়।
রাড্ডার কর্মীরা বলছেন, টিকাদানের পাশাপাশি সেন্টারটিতে মা ও শিশুদের নানা সেবা দেওয়া হত। গর্ভবতী নারীদের কম খরচে আল্ট্রাসনোগ্রাম, বিভিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ ছিল। তবে গত দুদিন ধরে টিকাদান আর প্রাথমিক কিছু পরামর্শ বাদে সব সেবাই বন্ধ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তার বলেন, হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কিছু কক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করে সীমিত পরিসরে সেবা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। শিশুদের ইপিআই টিকা, হাম-রুবেলা ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনের টিকা এবং গর্ভবতী মায়েদের টিটি টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেসি নিশ্চিত করা গেলে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন চেকআপও শুরু করা হবে। পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রেসক্রিপশন দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে বর্তমানে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও স্যানিটেশন সুবিধার সংকট রয়েছে। সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াশরুমের সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও জানানো হয়েছে।
ডা. নাসরিন আক্তার আরও বলেন, হামলার ঘটনায় নয়জনকে গ্রেফতারের খবর তারা পেয়েছেন। তবে ঘটনার নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
ভবিষ্যতে যেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে আর কোনো হামলা বা দখলের ঘটনা না ঘটে এবং সুবিধাবঞ্চিত মা ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে সেবা নিতে পারে, সেটি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, তিনটি সেমিপাকা ভবন পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে এবং পাকা ভবনটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জানালা-দরজা ও ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থাপনা পুনরুদ্ধার এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া সরকারি ডেটাবেজ পুনরায় তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।
মামলার বিবরণে বলা হয়, হাতুড়ি, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন এক দল লোক। তারা নৈশপ্রহরী আন্দ্রিয় সরকার ও মো. আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখেন। তারা এক্সকেভেটর নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে একটি সেমিপাকা ঘর, পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার আরেকটি সেমিপাকা ঘর এবং ক্লিনিক ইনচার্জ, চিকিৎসক ও ডেপুটি ক্লিনিক ইনচার্জের সেমিপাকা ঘর ভাঙচুর করেন।
এসব ঘরে থাকা আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়। বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রী, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যান। নৈশপ্রহরীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে সেখানে সমবায় সমিতির ব্যানার ও সাইনবোর্ড লাগিয়ে যান হামলাকারীরা।