রবিবার ● ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


ডিজেলের বাড়তি দামে নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাক ভাড়া
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫১ এএম  (ভিজিট : ১০)
ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়তেই ট্রাকভাড়ায় লেগেছে আগুন। দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে এক ট্রিপের ভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা। কোনো কোনো রুটে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। পরিবহন ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ এখন ছড়িয়ে পড়ছে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে। রাজধানীর কাঁচাবাজারেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ধাক্কার পর বাজারে দেখা দিচ্ছে দ্বিতীয় দফার চাপ।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানির নতুন দামের সঙ্গে সঙ্গেই পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন দর কষাকষি।

বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে : বেনাপোল থেকে ১৫ টন পণ্য ঢাকায় পরিবহনে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-২৬ হাজারে। চট্টগ্রাম রুটে ২৭-২৮ হাজার থেকে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৩৪-৩৫ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জে ২২-২৩ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭-২৮ হাজার টাকা। অর্থাত্ দূরত্ব ও গন্তব্যভেদে একেকটি ট্রিপে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা। কিছু রুটে এই বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বেনাপোল প্রতিনিধি কাজী শাহজাহান সবুজ জানান, ভাড়া বাড়ানো নিয়ে আমদানিকারক ও ট্রাকচালকদের মধ্যে দর কষাকষি এমনকি বাগিবতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য নিয়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয়ের এই পরিবর্তন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ট্রাক পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে টায়ার, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, টোল ও ফেরির খরচ। আবার একদিকে পণ্য নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পর অনেক ট্রাককে খালি ফিরতে হয়। ফলে জ্বালানির বাড়তি দাম এবং খালি ফেরার পরিচালন ব্যয়—দুই দিক থেকেই চাপ পড়ছে পরিবহন খরচে।

৮০ শতাংশ ব্যয় ডিজেলনির্ভর : বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর খান বলেন, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় না হওয়ায় মালিকরা চাপের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণে কিলোমিটার ও পণ্যের ওজনের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সঙ্গে ঐ কাঠামোয় ভাড়া সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

কাঁচাবাজারে দ্বিতীয় ধাক্কা : ট্রাকভাড়ার বাড়তি চাপ ইতিমধ্যে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও দৃশ্যমান। কাওরান বাজারে গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য আনতে ট্রাক ও পিকআপের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচ খেত থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকার এবং পাইকার থেকে খুচরা পর্যায়ে ভাগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।

আমদানি পণ্যেও বাড়ছে লজিস্টিক ব্যয় : শুধু অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন নয়, আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও বাড়ছে সরবরাহ ব্যয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি বেসরকারি আইসিডি ও অফডক পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কয়েকটি চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে বন্দর থেকে পণ্য বের হওয়ার আগেই ট্রাকভাড়ার পাশাপাশি বাড়তি হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ  জানিয়েছেন, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়া অনিবার্য। এর প্রভাব উত্পাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যয় হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।

তিনি জানান, রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং আমদানি কনটেইনারের ২০-২৩ শতাংশ বেসরকারি অফডকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ট্রাকভাড়ার বাড়তি চাপের সঙ্গে এখন লজিস্টিক ব্যয়েরও নতুন চাপ যুক্ত হয়েছে।

আবার বাড়ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ভাড়া : চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানির দাম বাড়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ট্রিপপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এবার ডিজেলের দাম নতুন করে ২০ টাকা বাড়ায় একই রুটসহ দেশের অন্যান্য পণ্য পরিবহন পথেও ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিবহন মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, গণপরিবহনের মতো পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো করা হোক। কিলোমিটার, পণ্যের ওজন এবং গাড়ির ধরন বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হলে জ্বালানির দাম বাড়ার পর প্রতিবার নতুন করে দর কষাকষির প্রবণতা কমবে বলে মনে করছেন তারা।

ডিজেলের বাড়তি দাম তাই শুধু ট্রাকের হিসাব বদলাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে পণ্য বাজারে পৌঁছানোর খরচও। বন্দর থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হলে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]