‘যত মত, তত পথ’—এই কথার মধ্যেই অনেক সাহস আছে জানিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, মানুষের মধ্যে ধর্ম ও জাতপাতের বিভাজন তৈরি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে তার ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই বিভাজনের পরিবর্তে শান্তি ও মানুষের পথেই এগিয়ে যেতে হবে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘যত মত, তত পথ’—এই কথার মধ্যেই অনেক সাহস আছে। আজমির শরিফে সবাই যায়। সেখানে কোনো জাতপাত বা ধর্মের বিভাজন নেই।
বিভাজনকারীদের সঙ্গে লড়াই-ঝগড়ায় না গিয়ে তাদের প্রশ্ন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ইচ্ছা করে পথ হারিয়েছে, নাকি সত্যিই পথ হারিয়ে ফেলেছে, সেটি ভাবতে হবে। বর্তমান সময়ে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়েও সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, শান্তির পথে লড়াই অনেক, তাই এ পথে চলতে হলে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বক্তব্যে কোভিড মহামারির উদাহরণ টেনে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের আগে কাউকে জিজ্ঞেস করেনি সে মুসলমান, খ্রিস্টান নাকি হিন্দু। একইভাবে করোনার টিকাও ধর্মভেদে আলাদা ছিল না। মুসলমান, হিন্দু কিংবা শিখ—কারো জন্য আলাদা ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি; ভ্যাকসিন হয়েছে মানুষের জন্য।’
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, তিনি ব্যারাকপুরের সাংসদ থাকাকালে তার নির্বাচনী এলাকায় অনেক মুসলিম মানুষ ছিলেন। তিনি তাদের কখনো শুধু মুসলিম কিংবা হিন্দু হিসেবে দেখেননি, মানুষ হিসেবে দেখেছেন।
বিভাজন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এমন কোনো ল্যাবরেটরি আছে কি, যেখানে কারো রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে বলা যাবে—কে পারসি, কে খ্রিস্টান, কে মুসলমান কিংবা কে হিন্দু? কেউ তা বলতে পারবে না। তার মতে, এটাই মূল কথা।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক গুণী মানুষ ও সুফি-সাধক এসেছেন। তিনি এমন কোনো ধর্ম দেখেননি, যা মানুষের কথা বলে না বা মানুষের ভালোবাসার কথা বলে না। ধর্মের নামে কেউ ব্যবসা করলে সেটি আলাদা বিষয়; কিন্তু কোনো ধর্মই মানুষ ও মানুষের ভালোবাসার বিপক্ষে নয়।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি সব ধর্মগ্রন্থ পড়েছেন—এমন দাবি করেন না। তবে তার বন্ধু-বান্ধব সব ধর্মের মানুষ এবং তাদের মধ্যে তিনি কোনো বিভাজন দেখতে পাননি।
লালন ফকিরের দর্শনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। স্রষ্টা মানুষের মধ্যেই আছেন—এমন ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, লালনও জাতের কোনো দৃশ্যমান রূপ খুঁজে পাননি। মানুষের পরিচয় ও বিভাজন নিয়ে লালনের দর্শনেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তিনি আরো প্রশ্ন করেন, মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে এবং যখন চলে যায়, তখন কী চিহ্ন নিয়ে আসে আর কী চিহ্নই বা নিয়ে যায়?
তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, পথে অনেক কিছু আসবে। তবে কারো সঙ্গে ঝগড়া করার প্রয়োজন নেই। পথটি সঠিক পথ, মানুষের পথ।
পৃথিবী একদিকে এগিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শান্তি ফিরে পেতে হলে এই পথই বজায় রাখতে হবে।