একসময় একক নাটকের গল্প মানেই ছিল দুজন মানুষের গল্প। একজন নায়ক, একজন নায়িকা; তাঁদের প্রেম, অভিমান, বিচ্ছেদ কিংবা পুনর্মিলন। যেন জীবন মানেই কেবল দুটি মুখ, দুটি হৃদয়। অথচ বাস্তব জীবন তো কখনোই এত সরল নয়। একজন মানুষের হাসি-কান্না, সংগ্রাম, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার পেছনে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, অসংখ্য সম্পর্ক, বহু মানুষের ভালোবাসা, ত্যাগ আর প্রত্যাশা।
দীর্ঘদিন সেই বাস্তবতা থেকে দূরে ছিল আমাদের একক নাটক। দর্শকের একটি বড় অংশের মনে তাই প্রশ্ন ছিল—স্বল্প সময়ের একটি নাটকে কি একটি পরিবারের গল্প বলা যায় না?
সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন নির্মাতারা। আর সেই উত্তরই বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের একক নাটকের ভাষা, বিষয় এবং দর্শকের প্রত্যাশা।
প্রেমের বাইরে জীবনের বিস্তৃত ক্যানভাস
নাটক মূলত মানুষের গল্প। মানুষের ভেতরের আলো-অন্ধকার, সম্পর্কের জটিলতা আর সময়ের অভিঘাতের গল্প। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে একক নাটকের বড় অংশ আটকে ছিল প্রেমের পরিচিত ছকে। প্রেম, বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা ত্রিভুজ সম্পর্ক—একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে অনেক গল্পই যেন নিজস্ব বৈচিত্র্য হারাতে বসেছিল।
কিন্তু জীবন তো কেবল প্রেমের নয়। সেখানে আছে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ভাইবোনের টানাপোড়েন, সন্তানের দায়বদ্ধতা, সংসারের হিসাব, বৃদ্ধ বয়সের একাকিত্ব, উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রতিবন্ধী সন্তানের সংগ্রাম কিংবা জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখা অতীত।
এই অনিবার্য সত্যটিই এখন নতুন করে আবিষ্কার করছে একক নাটক।
পরিবার—সবচেয়ে বড় নাট্যমঞ্চ
একটি পরিবারই আসলে সবচেয়ে বড় নাট্যমঞ্চ। যেখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় অসংখ্য গল্প। কখনও আনন্দের, কখনও বিষাদের; কখনও হাসির, কখনও অশ্রুর।
আজকের একক নাটক সেই ঘরের দরজাই খুলে দিচ্ছে দর্শকের সামনে।
‘তোমাদের গল্প’ নাটকে ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারের পুনর্মিলন যেমন হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তেমনি ‘তোমাদের গল্প–২’-এ দুই পরিবারের সম্পর্ক, প্রেম, বিয়ে এবং আত্মত্যাগের করুণ পরিণতি দর্শককে ভাবিয়ে তোলে।
এখানে প্রেম আছে, কিন্তু প্রেম একমাত্র বিষয় নয়; বরং সম্পর্কের বৃহত্তর বৃত্তের একটি অংশমাত্র।
যেখানে গল্প হয়ে ওঠে জীবনের প্রতিচ্ছবি
বর্তমান সময়ের পারিবারিক গল্পভিত্তিক একক নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বাস্তবতা। ‘এক মুঠো সুখ’-এ চাকরি হারানো এক যুবক নিজের কষ্ট আড়াল করে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, অসুস্থ মা এবং বিয়ের অপেক্ষায় থাকা বোনকে আগলে রাখে। এই গল্প কেবল একজন মানুষের নয়; এটি মধ্যবিত্ত বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
'ভোরের ট্রেন', ‘প্রতিদান', কিছু কথা বাকি’, ‘ফ্যামিলি ম্যান’ কিংবা ‘ভালোবাসার গল্প’-এও পরিবারের জন্য মানুষের অবিরাম সংগ্রামই হয়ে ওঠে গল্পের মূল সুর। দর্শক এসব নাটকে অভিনয় দেখেন না; যেন নিজের জীবনটাই দেখতে পান।
সামাজিক দায়বদ্ধতার নতুন ভাষা
একক নাটকের এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। ‘পারিজাতের জন্য ভালোবাসা’ এবং ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটক আমাদের সামনে তুলে ধরে বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষদের জীবন এবং তাঁদের পরিবারগুলোর নীরব যন্ত্রণা। ‘ভটভটি’ আত্মসম্মান, যৌতুকপ্রবণতা এবং পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তনের গল্প বলে। ‘বোবা ভাষা’, ‘নট এ লাভ স্টোরি’, ‘কসম’, ‘সন্ধ্যা ৭টা’ কিংবা ‘পানকৌড়ি’ প্রেমের আড়ালে সমাজ, ক্ষমতা, বৈষম্য, আত্মত্যাগ এবং মানবিকতার জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এ যেন বিনোদনের ভেতর দিয়ে সমাজকে আয়নায় দেখার এক নীরব প্রয়াস।
বহুমাত্রিক চরিত্র, বিস্তৃত অভিনয়ের পরিসর
পারিবারিক গল্পের বিস্তারের ফলে বদলে গেছে অভিনয়ের জগতও। একসময় যাঁরা কেবল বাবা, মা কিংবা প্রতিবেশীর ছোট ছোট চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন, আজ তাঁরাই অনেক নাটকের কেন্দ্রীয় শক্তি। আবুল হায়াত, খায়রুল আলম সবুজ, শহীদুজ্জামান সেলিম, আজিজুল হাকিম, সমু চৌধুরী, ইন্তেখাব দিনার, দিলারা জামান, নাদের চৌধুরী, মাহমুদুল ইসলাম মিঠু, শফিউল আলম বাবু, মাসুম বাশার, নরেশ ভূঁইয়া, মিলি বাসার, শিল্পী সরকার অপু, সাবেরী আলম, দীপা খন্দকার, মনিরা মিঠু, রোজী সিদ্দিকী ও নাবিলা আলম পলিনের মতো অভিনয়শিল্পীরা নতুন ধরনের চরিত্রে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
অন্যদিকে ফারহান আহমেদ জোভান, তৌসিফ মাহবুব, মুশফিক ফারহান, ইয়াশ রোহান, তানজিম সাইয়ারা তটিনী, কেয়া পায়েল, নিলয় আলমগীর, জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি, পারশা ইভানা, খায়রুল বাসার, সাদিয়া আয়মান, আইশা খানসহ নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও পারিবারিক গল্পে অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন পরিচিতি পাচ্ছেন।
দর্শক কেন এই গল্পে নিজেকে খুঁজে পান?
প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি পরিবারকে ঘিরে। প্রথম কান্না, প্রথম হাসি, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম হারিয়ে ফেলা, প্রথম দায়িত্ব—সবকিছুর শুরু সেই পরিবারেই। তাই পর্দায় যখন একজন ছেলে অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়ায়, একজন বাবা মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন, কিংবা একজন স্ত্রী সংসার টিকিয়ে রাখতে নীরবে লড়াই করেন—দর্শক সেখানে কেবল একটি চরিত্র দেখেন না; নিজের জীবনকে দেখতে পান। এই আত্মপরিচয়ের অনুভূতিই পারিবারিক গল্পকে দর্শকের কাছে এতটা গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
শেষ কথা
যে গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষেরই
সময়ের সঙ্গে নাটকের ভাষা বদলায়, গল্প বদলায়, দর্শকের রুচিও বদলায়। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—পরিবার—কখনো বদলায় না। হয়তো সে কারণেই একক নাটক আবার পরিবারের কাছে ফিরছে। প্রেম থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, বিরহও থাকবে। তবে সেগুলো আর একা থাকবে না। পাশে থাকবে বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস, সন্তানের দায়িত্ব, ভাইবোনের টান, শাশুড়ির মমতা, বৃদ্ধ বাবার নীরব অপেক্ষা, কিংবা একটি পরিবারের টিকে থাকার অনন্ত সংগ্রাম। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে বড় গল্পটি লেখা হয় পরিবারকে নিয়েই। আর সেই গল্পই যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন একক নাটক আর শুধু বিনোদন থাকে না—তা হয়ে ওঠে আমাদের সমাজ, সময় এবং জীবনেরই এক বিশ্বস্ত দলিল।