ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র দেশের জনগণ মেনে নেবে না। অতীতে জনগণ রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করেছে, প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াবে।
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
ফয়জুল করীম বলেন, ভারতের কিছু রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশকে নিয়ে ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণা প্রচার করে থাকে। তাঁর দাবি, এ ধরনের চিন্তাভাবনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
শায়েখে চরমোনাই বলেন, বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে চায় এবং কোনো বিদেশি শক্তির কর্তৃত্ব বা প্রভাব মেনে নেবে না। তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষায় সবসময় সচেতন থাকবে এবং প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধভাবে তা রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করা। কিন্তু কিছু মহল ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে এনে দেশে বিভাজন সৃষ্টি ও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দেশ। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, অপমান বা বৈষম্য সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
শায়েখে চরমোনাই অভিযোগ করে বলেন, কয়েকদিন আগে আবার জঙ্গি নাটক শুরু হয়েছে। এ ধরনের নাটকের মাধ্যমে দেশের আলেম-ওলামা, মাদরাসা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র থাকতে পারে এবং সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান রইলো।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই সিনিয়র নায়েবে আমির সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও আন্দোলনের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দেশ পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবারও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।
তিনি বলেন, আমরা চাই না সরকার ব্যর্থ হোক, আবার এটাও চাই না যে সরকার অতীতের শাসকদের পথ অনুসরণ করুক। কিন্তু সরকার যদি তাদের অঙ্গীকার থেকে সরে যায়, জবাবদিহিতা এড়িয়ে চলে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আবারও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হব।
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তার ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূতের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থকে একাকার করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও এখনো কোনো স্পষ্টীকরণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল। জনগণ চেয়েছিল রাজনৈতিক সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ঘুষ-দুর্নীতির অবসান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও দেশের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
সমাবেশে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদ জনগণের বিপুল সমর্থন পেয়েছিল এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তা জনআকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সনদে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর বাস্তবায়নে সরকার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই সনদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান সংসদের ছয় মাস পূর্ণ হতে চললেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, দেশের জনগণ নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকট চায় না। তবে সরকার যদি সংস্কার বাস্তবায়নে গড়িমসি করে এবং জুলাইয়ের চেতনা থেকে সরে যায়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সমাবেশে শেষে সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে একটি গণমিছিল বের হয়।