
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে নতুন একটি আইন করার আভাস পাওয়া গেছে। মন্ত্রিপরিষদ সূত্র থেকে এই আভাস মিলেছে। ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ চলমান রয়েছে। এরইমধ্যে সংলাপ শেষ করে জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি। যে কয়টি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করেছেন তারা সবাই নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে আইনে জোর দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে আইন করা না গেলে একটি অর্ডিন্যান্স করে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয় আইন প্রণয়ন করা উচিত বলেও রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এই সময়ের মধ্যে আইন করা সম্ভব না হলেও অর্ডিন্যান্স করা সম্ভব- এ ধরনের আভাস আছে। এদিকে আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে আইন করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ গতকাল বুধবার ক্রাইম রিপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ইজিএমে আইনমন্ত্রী বলেছেন, আইন করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাতে যে সময় রয়েছে, সে সময়ের মধ্যে আইন করা সম্ভব। তবে আইনটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে করতে হবে। তিনি বলেন, আইনের কাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। শধুমাত্র প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়টির ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি ঠিক করতে হবে। আইন করার বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কিছু মন্তব্য না করলেও কৌশলে তিনি বলেন, আইন করার ইঙ্গিত পেলে আমরা প্রস্তুত। তখন আইনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাবে। একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করতে ফেব্র“য়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লাগতে পারে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে এই আইন সংক্রান্ত কোনোকিছুই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পায়নি বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন শাখার ওই কর্মকর্তা। এদিকে আইন সচিব গোলাম সারোয়ার বলেন, এটি জুডিশিয়ারি ফাংশন। এটি আমাদের কাজ নয়। এটি কেবিনেট থেকে করা হয়। ইসি গঠনে নতুন আইন প্রণয়ন বিষয়ে সচিব বলেন, এটি আমাদের কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে না। এর আগে ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে ড. শামসুল হুদা কমিশনের পক্ষ থেকে ইসি গঠনে সংবিধান অনুযায়ী একটি আইন প্রণয়নের জন্য খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সেটা সরকারের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল।
সর্বশেষ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ১৮ নভেম্বর আইনমন্ত্রীর হাতে ইসি নিয়োগে আইনের প্রস্তাবিত খসড়া তুলে ধরা হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রস্তাবনা আইনমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
একদিনেই ইসি গঠনে আইন করা সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ২৮ ডিসেম্বর বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে সংলাপে অংশ নিয়ে এ দাবি জানায় ওয়ার্কার্স পার্টি।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ইসি নিয়ে তিন দফা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্য যে একই বিষয় নিয়ে তিনবার আসতে হলো। তিনি বলেন, ২০১১ সালে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ২০১৬ সালে একই প্রস্তাব দিয়েছি। আজও সেই প্রস্তাবই পুনরায় রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া হয়েছে। ইসি গঠনে আস্থাহীনতা দূর করতে হলে আইন করতেই হবে মন্তব্য করে রাশেদ খান মেনন বলেন, রাষ্ট্রপতিও মনে করেন, ইসি গঠনে আইন প্রণয়ন ফরজ হয়ে গেছে।
ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের বিষয়ে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতি আছে জানিয়ে মেনন বলেন, রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিতে পারেন। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীদের মতামত নিতে পারেন। এ ছাড়া সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শামসুল হুদার আমলে আইনের একটি খসড়া তৈরি করাই আছে। ওই খসড়াটি ধরেই আইন প্রণয়ন সম্ভব।
আইনের বিষয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল রাখা যেতে পারে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে এই সাংবিধানিক কাউন্সিল হতে পারে। এই কাউন্সিল সিইসি ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রস্তাব করবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল সংলাপকে নাটক বলছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, যারা নাটক বলছে, তারা নাটকের বিপরীতে কিছু করে দেখাক।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ইসি গঠনে আইন থাকবে। ওই আইনের অধীনে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য চার কমিশনারকে নিয়োগ করবেন। কিন্তু ৪৯ বছরে আইন না হওয়ায় গত দু'বার সার্চ কমিটির মাধ্যমে কাজী রকিব উদ্দীন এবং কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি গঠন করা হয়। এই ইসির মেয়াদ আগামী ফেব্র“য়ারিতে শেষ হচ্ছে।