বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


শেরপুরের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক দৃষ্টিনন্দন মাইসাহেবা মসজিদ
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৭:৫৬ পিএম   (ভিজিট : ৬৫৫)
শেরপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে শেরপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (এককালের তিন আনির জমিদার বাড়ি) গেটের পাশেই অবস্থান শেরপুরের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক ঐতিহাসিক "মাইসাহেবা মসজিদ"। মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন এই মসজিদটি জমিদার অধ্যুষিত শেরপুর শহর অঞ্চলে প্রথম নির্মিত হয় আনুমানিক ২৫০ বছর পূর্বে ১৮৬১ সালে। বিভিন্ন সময়ে নানা সংস্কারের পর আগের সেই মূল ভবনটি এখন আর নেই। তিনতলা বিশিষ্ট বর্তমান জামে মসজিদটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এখানে একত্রে প্রায় ৯ হাজার মুসল্লী জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। মহিলাদের নামাজের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। প্রতি শুক্রবার দূরদূরান্ত থেকে এসে অনেক মুসল্লিকে এই মসজিদে জুমার নামাজের জামাতে শরিক হতে দেখা যায়‌। ধর্মীয় অনুভূতি, প্রাচীন ঐতিহ্য ও স্থাপত্য সৌন্দর্যে এটি শেরপুর জেলার অন্যতম স্থান দখল করে আছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই এই মসজিদে প্রচুর অর্থ দান করে থাকেন। এটি ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ দানপ্রাপ্ত মসজিদ বলে অনুমান করা হয়। মসজিদে দান বাক্স থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা আয় হয়। মুসল্লিরা বলে থাকেন, এখানের নামাজে বিশেষ প্রশান্তি পাওয়া যায়। জনস্রুতি আছে এখানে দান করলে পূরন হয় মনস্কামনা, আবার বেয়াদবি করলে শাস্তি পেতে হয়।

মসজিদের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে হুজরাখানা, মোয়াজ্জিন ও ইমাম এর বাসস্থান। রয়েছে পরিচ্ছন্ন দুটি অজুখানা ও এস্তেঞ্জাখানা। মসজিদের ১জন ইমাম, ১জন পেশ ইমাম, ১জন মুয়াজ্জিন ১জন কম্পিউটার অপারেটর ও ৩জন খাদেম রয়েছেন। এছাড়াও দুইজন পাহারাদার ও চারপাশে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে আগত মুসল্লিদের তাদের গাড়ি ও মালামাল রেখে নিরাপদে নামাজ আদায় করতে। এখানে রয়েছে বয়স্কদের জন্য কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা। বহু সংখ্যক বয়স্ক মানুষ এখানে ফজরের নামাজের পর দুই ঘন্টা সহি শুদ্ধভাবে কুরআন ও তাজদিদ শেখেন।

মাইসাহেবার (সলেমুন্নেছা বিবি) নির্মিত আদি মসজিদটি ছিলো ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট সেই মসজিদের ছিল ৪০ ইঞ্চি পুরু ইট-সুরকির দেয়াল। এর দরজা ছিল ৫টি এবং ২টি কাতারে ১৮ জন করে ৩৬ জন মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারতেন। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পর এই মহীয়সী নারীর কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুসল্লীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মসজিদটি সম্প্রসারণের পয়োজন দেখা দেয়। এজন্য সর্বপ্রথম ১৯০৩ সালে ভবনটির সম্প্রসারণ করে আরো তিনটি কাতার বৃদ্ধি করা হয়।

শেরপুরের অন্যতম স্থপতি আব্দুল্লাহ ইবনে সাদিক শাহীন ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাচীন স্থাপত্যের সাথে আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর সংমিশ্রণে মসজিদটির নকশা তৈরি করেন যা দেশের যে কোন মসজিদ থেকে আলাদা সৌন্দর্যমণ্ডিত। সেই নকশা অনুযায়ী ২০০১ সালে নতুনভাবে শুরু করা হয় বর্তমান আধুনিক মসজিদটির নির্মাণ কাজ। প্যারাপেট ওয়াল দ্বারা আচ্ছাদিত ছাদ  অনেকগুলো ছোট ছোট গম্বুজ বিশিষ্ট এবং বড় গম্বুজ আছে ৮টি। উপরে উঠার জন্য রয়েছে ৩টি প্রশস্ত সিঁড়ি।

মসজিদটি দৃষ্টিনন্দন সীমানা প্রাচীর দ্বারা ঘেরা এবং এতে রয়েছে আরবি ক্যালিগ্রাফি খচিত দুটি দৃষ্টিনন্দন প্রবেশপথ, যার প্রতিটিতে ৪টি ছোট ও একটি করে বড় গম্বুজ রয়েছে। এর বাইরের সৌন্দর্য যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। ৯৫ ফুট ও ৮৫ ফুট উঁচু দৃষ্টিনন্দন ২টি মিনার শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখা যায়। 

মসজিদের নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায় না। পণ্ডিত ফসিহুর রহমানের লেখা " শেরপুর জেলার অতিত ও বর্তমান" গ্রন্থ, মুহম্মদ মুহসীন আলীর পুস্তিকা " মাইসাহেবা মসজিদ" ও বিভিন্ন তথ্য সূত্র থেকে জানা যায়, প্রায় ২৫০ বছর আগে মহারাজা সুসঙ্গের দানের ভূমিতে মসজিদটি নির্মিত হয় ১৮৬১ সালে। শেরপুরের পার্শ্ববর্তী মুক্তাগাছা এবং সুসঙ্গের জমিদার ছিলেন প্রতাপশালী এবং ইংরেজ সরকার থেকে মাহারাজা উপাধি প্রাপ্ত।  শেরপুরের ছোট ছোট জমিদাররা তাঁদের খুশি করতে সচেষ্ট থাকতেন।সুসঙ্গের মহারাজা একদা শেরপুরের উত্তরে গারো পাহাড় অঞ্চল দেখতে এলে নয় আনীর জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী ও তিন আনির জমিদার রাধাবল্লব চৌধুরী সহ অপরাপর জমিদাররা তাঁকে শেরপুরে আসতে নিমন্ত্রণ করেন। কিন্তু মহারাজা অন্যের জমিতে আহার ও রাত্রি যাপনে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। শেরপুরের জমিদারি বিভিন্ন ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবার পরেও তিন আনির জমিদার বাড়ির পাশে ২৭ একর লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল। শেরপুরের জমিদাররা উক্ত জমি সুসঙ্গ রাজার নামে লিখে দেবার পর তিনি নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন।

ভ্রমণ শেষে ফিরে যাবার সময় মহারাজা সেই জমি পূণ্যবান কাউকে দান করতে মনস্থ করেন। অনেকেই প্রার্থী হলেও কাওকে তিনি উপযুক্ত সাব্যস্ত করতে পারলেন না। তিনি জানতে পারেন কাছেই এক সাধক ফকিরের অবস্থানের কথা। ওই ফকিরকে তাঁর ইচ্ছা জানানো হয়, কিন্ত বিনয়ের সাথে  ফকির সাহেব বলেন তার বেশী জমি দরকার নেই। কেবলমাত্র সাধনাস্থলের জায়গাটুকু পেলেই তিনি সন্তুষ্ট। তার কথায় মহারাজা মুগ্ধ হয়ে ২৭ একর জমিই তাঁকে দানপত্র করে দেন। সেই ফকিরেরর নাম ছিল মীর আব্দুল বাকী। 

মীর আব্দুল বাকীর জীবনের সুদীর্ঘ সময়ের সাথী ছিলেন স্ত্রী সালেমুন্নেছা বিবি ও ভাগ্নে সৈয়দ আব্দুল আলী। শেরপুর শহরের শেরীপাড়ার সৈয়দ বংশীয় প্রখ্যাত মুসলিম পরিবারের সৈয়দ আজিম উদ্দিন এর পরবর্তী ৪র্থ প্রজন্ম সৈয়দ আবুল আলীর খালা ছিলেন সালেমুন্নেছা বিবির জন্ম পাবনা জেলার ইমামবাড়ী। অপরদিকে  তাপস প্রবর মীর আব্দুল বাকী ছিলেন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহর নিয়োগ প্রাপ্ত একজন সুবেদার। তিনি এক সময়ের শেরপুর অঞ্চলের কোচ রাজ্যের রাজধানী গরজড়ীপা কেল্লার দায়িত্ব নিয়ে আসেন। এক সময়ে তিনি সুফি সাধকদের সহচার্যে এসে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং মোঘল সম্রাটের সামরিক ছাউনীর কমান্ডিং অফিসারের লোভনীয় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ধ্যান সাধনায় নিমগ্ন হন। সুফি সাধকদের সান্নিধ্য পেতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে তিনি শেরপুরে জঙ্গল বেষ্ঠিত নির্জন স্থান পেয়ে মসজিদের অদুরে তমাল গাছের তলায় অবস্থান গ্রহণ করেন। এদিকে অকালে সন্তান হারিয়ে নিসন্তান সালেমুন্নেছা বিবি সেসময় ভাগ্নে সৈয়দ আবুল আলীকে নিয়ে গড়জড়ীপা কেল্লাতেই অবস্থান করতেন। তিনিও ছিলেন তাপসী মহিলা। সুসঙ্গ মহারাজার দান গ্রহণের পর ধ্যান সাধনার জন্য তিনিও ভাগ্নেকে নিয়ে সাধক স্বামীর আস্তানায় এসে বসবাস শুরু করেন। সুফি দম্পতির সেই আস্তানা উচ্ছেদ করতে মরিয়া হয়ে উঠেন তিন আনির জমিদার রাধাবল্লব চৌধুরী। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও সেই দম্পতির সাহসীকতার জন্য ব্যর্থ হন। ইতিমধ্যে সাধক আব্দুল বাকী বিল্লাহ ইন্তেকাল করলে মসজিদের উত্তরে তাঁকে দাফন করা হয়। সালেমুন্নেছা বিবি ভাগ্নেকে নিয়ে কিছুদিন সেখানেই অবস্থান করে একসময় শেরী পাড়ায় বসতী স্থাপন করেন। সেসময় তিনি ভাগ্নে ও স্থানীয় মুসলমানদের সহযোগিতায় স্বামীর কবরের পাশে হুজড়া খানার জায়গায় শেরপুর শহরাঞ্চলের প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেন।

তিন আনির জমিদার রাধাবল্লব চৌধুরী মসজিদটি উচ্ছেদের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মসজিদের তত্বাবধান করেন সালেমুন নেছা বিবি এবং তাঁর মৃত্যুর পর ভাগ্নে সৈয়দ আব্দুল আলী। পূণ্যময়ী ওই নারীকে সবাই মা সাহেবা বলে সম্বোধন করতো। মা সাহেবা থেকেই মসজিদের নামকরণ হয় মাইসাহেবা মসজিদ। মৃত্যুর পর তাঁকে স্বামীর পাশেই দাফন কার হয়। তাঁদের কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে ভাগ্নে সৈয়দ আব্দুল আলীকেও। পাশাপাশি অবস্থিত কবর তিনটি বর্তমান মসজিদের ভেতরে পড়েছে এবং চারদিকে ঘেরাও করে সবুজ গালিচায় ঢেকে রাখা হয়েছে। 

মুসল্লি সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯০৩ সালে মসজিদটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন এলাকার সম্ভান্ত মুসলিম সৈয়দ সিরাজুল হক জান মিয়া ও খান সাহেব আফসর আলী মিয়া। উল্লেখ্য যে, জান মিয়া সিলেট থেকে শেরপুর এসে বসবাসকারী সাধক 'শাহ চিনতি মাসুক' এর বংশধর ছিলেন। এতে তিন আনির জমিদার আবারও বাধ সাধলে তাঁরা তৎকালিন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লা হকের সরণাপন্ন হন। সলিমুল্লা হক বিষয়টি তদন্ত করতে তাঁর সেরেস্তার ম্যানেজার জনৈক ইংরেজ সাহেবকে শেরপুরে পাঠান। তাঁর দেয়া তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে নবাব সাহেব জমিদার রাজবল্লবকে মসজিদ সম্প্রসারণে বাধা না দিতে পত্র পাঠালে তিনি আর বাধা প্রদানের সাহস করেননি। ইতিমধ্যেই শেরপুরে জমিদারদের বিরুদ্ধে জন অসন্তোষ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে মসজিদ উচ্ছেদের চেষ্টা থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন জমিদার। কিন্তু ১৯০৯ সালে ২৭ একর জমির মধ্যে মসজিদের ৮ শতাংশ বাদে সমস্ত জমি সুকৌশলে নিজের নামে সিএস রেকর্ডভূক্ত করে দখল করে নেন তিনানির জমিদার রাধাবল্লব। প্রতিকার চেয়ে মামলা সাধক বাকির পরবর্তী বংশধর সৈয়দ আফরোজ উদ্দিন। কিন্তু অপর নিকটাত্মীয় সৈয়দ শাহাবুদ্দিনের নিকট রক্ষিত সুসঙ্গ রাজার তাম্রপত্রে লিপিবদ্ধ দলিলটি ফেরত না দেয়ায় আদালতে দলিল উপস্থাপন করতে না পারায় আইনি জটিলতায় মামলা খারিজ হয়ে যায়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে জমিদাররা দেশ ছাড়ার সময় তিন আনির জমিদার ঝিনাইগাতী উপজেলার জুলগাঁও এর বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিনকে তিন আনির হিস্যায় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করে দেন। সেই মূলে প্রাপ্ত হয়ে তিনি মসজিদের পূর্ব পাশের ৬৫ শতাংশ জমি মসজিদ কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করেন। সেই ৭৩ শতাংশ জমির উপরেই নির্মিত হয়েছে শেরপুর জেলার সর্ববৃহৎ ও ঐতিহাসিক মাইসাহেবা মসজিদ।









আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]