রিকশাচালক, মুচি থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে আগামী নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে সরাসরি টাকা লেনদেনের সুযোগ চালু হচ্ছে। তখন যে কেউ নিজের কিউআর কোড ব্যবহার করে অন্যের কাছ থেকে টাকা নিতে এবং টাকা পাঠাতে পারবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বেলা ১১টায় বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পরিশোধ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ওয়ান ব্যাংক পিএলসি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের কার্যক্রম চারটি ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে সবার জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ব্যবস্থাটির কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তঃসংযোগভিত্তিক এ লেনদেনব্যবস্থায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক লেনদেন পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। আন্তর্জাতিক কার্ডভিত্তিক লেনদেনব্যবস্থার সক্ষমতার সঙ্গে দেশের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর জানান, প্রায় ১০০টি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে একই আন্তঃসংযোগভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলে শুরুতেই সবার জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে কার্যক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তবে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে ব্যবস্থাটির কার্যক্ষমতা নিয়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখা যায়।
এরপর গত ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের প্রচার ও প্রসারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে লেনদেনের চার্জ শূন্য করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মোস্তাকুর রহমান বলেন, দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার, এক লাখ কিংবা দুই লাখ টাকা—যেকোনো অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রেই এ চার্জ প্রযোজ্য হবে না।
বাংলা কিউআরের অগ্রগতি তুলে ধরে গভর্নর বলেন, জুনের প্রথম সপ্তাহে এ ব্যবস্থায় দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দৈনিক গড় লেনদেন চার গুণের বেশি বেড়েছে।
তবে এ অগ্রগতিকে এখনই চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। গভর্নর বলেন, বাংলা কিউআরের যাত্রায় এখনো সামান্য পথ অতিক্রম করা হয়েছে। দৈনিক প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা লেনদেন হলে এ ব্যবস্থাকে একটি যুক্তিসংগত অবস্থানে পৌঁছেছে বলে বিবেচনা করা যাবে।
বাংলা কিউআরের পাশাপাশি সরকারের ডিজিটাল জনপরিকাঠামো উদ্যোগের বিষয়েও কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
তিনি বলেন, ডিজিটাল জনপরিকাঠামোর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। এগুলো হলো ডিজিটাল পরিচয়, ডিজিটাল লেনদেন এবং তথ্য বিনিময়।
ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে জন্মের পর একজন নাগরিকের পরিচিতি তৈরি হবে, যা তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল থাকবে। অন্যদিকে, তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য বারবার ছোটাছুটি করতে হবে না। পরিচয় নম্বরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সনদ ও তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, ডিজিটাল জনপরিকাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টার ঘোষণার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি উদ্যোগ নিয়েও কাজ চলছে।
বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সহযোগিতায় বাংলা কিউআর নিয়ে জনসচেতনতা বেড়েছে। এখন শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও এ উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার সময়ও বাংলা কিউআর সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের প্রচার ও প্রসারে গণমাধ্যমের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।