২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর মব-হামলা, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশে আসছেন জাতিসংঘের শিক্ষার অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফরিদা শহীদ। আগামী ২৩ নভেম্বর ঢাকায় এসে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি মবের শিকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং ঘটনায় নিহত শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন।
মবের শিকার শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক মব-সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, তাদের মধ্যে অন্তত আটজন শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক শিক্ষক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। এ ছাড়া ৯৪০ জন শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। তবে এসব সংখ্যা সরকারি কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান নয়; সংগঠনটির দেওয়া হিসাব।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতাদের দাবি, এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক নির্দেশনা জারি করা হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও শিক্ষক ইনডেক্স বাতিল হয়েছে, আবার কারও বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। আদালত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন করেও অনেকে প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তাদের।
পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোটের সভাপতি এবং ঢাকা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. বেদার উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়ে আসছি। সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও অনেক শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। জাতিসংঘের দল ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের বক্তব্য শুনলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।’
জোট সূত্র জানায়, মবের শিকার শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ তাদের অভিযোগ জাতিসংঘের কাছে পাঠিয়েছেন। এ জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি ফরমও দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২ হাজার শব্দের মধ্যে অভিযোগ ও তথ্য-উপাত্ত পাঠাতে বলা হয়েছে। হেনস্তার বিবরণ, বর্তমান অবস্থা, অভিযোগ বা মামলার তথ্য, ছবি, ভিডিও, অডিও, আইন অমান্যের প্রমাণসহ অন্যান্য সহায়ক তথ্য যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষক জাতিসংঘের কাছে অভিযোগ পাঠিয়েছেন, সে সংখ্যা জানা যায়নি।
একই সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের একটি অংশও মবের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের পদধারী শিক্ষার্থীদের অনেকে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। কেউ কেউ পরীক্ষা দিতে গিয়েও মবের মুখে পড়েছেন বলে শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন।
জোটের সাধারণ সম্পাদক ও ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, জোর করে পদত্যাগ, শারীরিক লাঞ্ছনা, বেতন বন্ধ করে দেওয়া এবং কর্মস্থলে যেতে বাধা দেওয়ার কারণে শুধু শিক্ষক নন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নির্দেশনা থাকলেও ফিরতে পারেননি অনেকে
শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর পরের মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে নির্দেশনা জারি করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের সমস্যার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ৭ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে চাকরি পুনর্বহাল এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতা চালুর কথা বলা হয়। ৭ অক্টোবর সরকারি আদেশ অমান্যকারী ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির পরিপত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদানে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। তাদের দাবি, কিছু ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধান বেতন-ভাতা চালু করেননি এবং ইএফটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও হালনাগাদ করা হচ্ছে না। ফলে ৯৪০ জনের মতো শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে তাদের দাবি।
হামলার পর হাসপাতালে ভর্তি হন প্রধান শিক্ষক
মবের শিকার শিক্ষকদের একজন রাজধানীর আরমানিটোলার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেন। একই দিন কমিটি ছাড়াই মোখলেছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
নাজমা বেগমের অভিযোগ, এরপর তাঁর স্কুলের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। তদন্তের কাজে বিদ্যালয়ে গেলে তাঁর ওপর হামলা হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাত দেড়টার দিকে পুলিশ তাঁকে বাসা থেকে থানায় নিয়ে যায় এবং আদালতে পাঠায়।
নাজমা বেগম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর সরকারি বেতন ছাড় করে।
তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইএফটির মাধ্যমে স্কুল ও সরকারি বেতন পাচ্ছি। কিন্তু বদলির জন্য প্রয়োজনীয় এনওসি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে সমস্যা যায়নি। আমার তিন সন্তানের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বিধবা। মানবেতর জীবনযাপন করছি।’
চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগে সই
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমও ২০২৪ সালের আগস্টে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেন।
ফারহানা খানম বলেন, ‘আমাকে চার ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়েছে। সাদা কাগজেও বাংলা ও ইংরেজিতে সই নেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায়কেও জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তিনি সাধারণ শিক্ষক হিসেবে থাকতে চেয়েছিলেন। সেই সুযোগও দেওয়া হয়নি।’
পদবঞ্চিত শিক্ষক জোটের নেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও বহিরাগতদের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ওপর চড়াও হয়। তাদের দাবি, কোথাও পদ দখল, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং কোথাও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটেছে।
মবের মাধ্যমে পদত্যাগ করানোর পর কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটি বা অবসর দেওয়া কিংবা বরখাস্ত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অস্থিরতা ও পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে শিক্ষক নেতারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আদালতে গিয়েও অনিশ্চয়তা
রাজধানীর সোলমাইদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আফরোজা বেগম বলেন, জোরপূর্বক পদত্যাগ করা শিক্ষকদের অধিকার ও পুনর্বহাল নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। তিনিও ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করা শিক্ষকদের পক্ষে হাইকোর্টের একটি রায় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার বলেন, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও আদালতের আদেশের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন।
শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ
রাজধানীর বিসিএসআইআর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. মো. ইদ্রিস আলী বলেন, শিক্ষককে অপমান, শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা বা মবের চাপে পদত্যাগে বাধ্য করা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন নয়; এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লে শৃঙ্খলা ও পাঠদানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতাদের মতে, জাতিসংঘের পর্যালোচনায় জোরপূর্বক পদত্যাগ ও মব-সহিংসতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।