শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬ ● ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস আজ
আয়ু বাড়ছে, প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থাও বাড়ানোর তাগিদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৩ পিএম  (ভিজিট : ২০)
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দ্য এজ অব লংজিভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’, অর্থাৎ ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।

মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মসংস্থান, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগসহ প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

সম্প্রতি আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে মতিঝিল যাওয়ার জন্য আসেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জু আরা বেগম। তিনি জানান, মেট্রোরেলের ভাড়ায় প্রবীণ নাগরিকদের ২৫ শতাংশ ছাড়ের কথা উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মীর কাছে সহযোগিতা চান। তবে ওই কর্মী তাকে সহযোগিতা না করে অন্যদিকে যেতে বলেন।

মঞ্জু আরা বেগম বলেন, ২০১৩ সালে সরকার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা এবং একই বছর পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন করেছে। কিন্তু এসবের বাস্তবায়ন যথেষ্ট নয়। দেশে প্রবীণের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবীণবান্ধব কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সিদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০১ সালে এ হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বিশ্বজুড়েও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম কর্মসূচি বয়স্কভাতা। দরিদ্র, স্বল্প উপার্জনক্ষম ও উপার্জনে অক্ষম প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এ কর্মসূচি চালু হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বয়স্কভাতা দিয়ে প্রবীণদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন, নিরাপদ ও সহজগম্য পরিবেশ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পরিবারে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি।

মঞ্জু আরা বেগম বলেন, ‘মাসে আমার ওষুধ লাগে ২০ হাজার টাকা আর আমার স্বামীর ১০ হাজার টাকা। এই খরচ মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে চালানো কষ্টকর।’

প্রবীণদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে নিঃসঙ্গতা। প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামীমা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমসে থাকছেন। স্বামী-সন্তানরা বছরে দুইবার তাকে দেখতে আসেন। জীবনের শেষ সময়ে দেশের মানুষ, খাবার ও পরিবেশের মধ্যে থাকতে চেয়েই তিনি সেখানে বসবাস করছেন।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদও সস্ত্রীক সেখানে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, শিশু, তরুণ, পূর্ণবয়স্ক কিংবা প্রবীণ—দেশের সব নাগরিকের মানবিক মর্যাদা নিয়ে বসবাসের অধিকার রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে, তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, অতীতের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। স্বামী-স্ত্রীর একজন মারা গেলে অন্যজনের একাকিত্ব আরও বাড়ে। সন্তানরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকেন, নাতি-নাতনিরাও পড়াশোনা ও খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে। ফলে অনেক প্রবীণ নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল অনেক প্রবীণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য নেই। তাদের সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারকে এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবার দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল (জেবিএফআরএইচ) প্রতিষ্ঠা করেছেন অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম। সেখানে ৭০০ বর্গফুটের ৫-তারকা মানের ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ২২৪টি বিক্রি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম এই প্রবীণ নিবাসের প্রথম বাসিন্দা। তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।

আশা ইসলাম নাঈম বলেন, ‘বাবা প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। আমরা অনেক কষ্ট ও অনিরাপত্তার মধ্যে ছিলাম। এখানে আসার পর তিনি সবার সঙ্গে আনন্দে আছেন।’

অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম বলেন, প্রবীণদের সেবা বলতে সাধারণত দরিদ্রদের থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা বোঝানো হয়। কিন্তু উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের নিঃসঙ্গতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অর্থ-সম্পদ থাকলেই একজন প্রবীণ নিরাপদ ও নিঃসঙ্গতামুক্ত থাকবেন—এমন নয়।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়; দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য কেমন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নতুন করে ভাবারও দিন।

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রতিটি মানুষের বার্ধক্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। প্রবীণদের একটি বড় অংশ অবনতিশীল স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণার আলোকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স্কভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি ও উপকারভোগীর সংখ্যা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]