
বাংলাদেশ ভারতকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
সালেহ বলেন, আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত করার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি।
ভারত বলেছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে এবং তাকে স্মরণীয় স্বাগত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ত্রিবেদী।
এ ধরনের প্রকাশ্য আগ্রহ ভারতের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক। কোনো প্রতিবেশী দেশের নেতাকে স্বাগত জানানোর জন্য দিল্লি সাধারণত এতটা আগ্রহ দেখায় না।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেন, আমি মনে করি, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কারণ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট এগিয়ে গেছে।
শ্যাম শরণ বলেন, বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক কিছু প্রয়োজন মেটাতে ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা ভিসা দেওয়া। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে নেওয়া কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরায় চালু করা হয়েছে।
অবশ্য দুই দেশের জন্যই অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কও রয়েছে। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বেশির ভাগই ভারতের পক্ষে ছিল।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যোগাযোগ আরও সহজ করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসিনাকে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ বলে জানায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে গঠিত সরকারের বিষয়ে করা মন্তব্য, তারা সমর্থন করে না।
সময়টিও ছিল বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার আগে তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন—এমন খবর পাওয়া যাচ্ছিল।
তিনি বলেন, এটি আসলে বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার বিষয়ে কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তারেক রহমানের জন্য তাই হাসিনা ভারতে থাকা অবস্থায় দিল্লি সফর করা দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
তবে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগ্রহ শুধু হাসিনাকে ঘিরে নয়। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠন শুরু করেছে।
ঢাকা ও ইসলামাবাদ উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় করেছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছে। দিল্লি এসব বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সম্প্রতি ঘোষিত মক্কা চুক্তি—এই মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি—নিয়েও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিটির বিস্তারিত বিষয় এবং প্রতিটি পক্ষের দায়িত্ব কী, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি হয়েছে—অর্থাৎ কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে আমাদের এতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়।
তিনি আরও বলেন, এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অধ্যাপক ইয়াসমিন মনে করেন, ঢাকার এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোনো উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কিছুটা সতর্ক হওয়া উচিত। শুধু ভারতকে বিরক্ত করার বিষয় নয়; বাংলাদেশকে কিছু সময় অপেক্ষা করে দেখতে হবে বিষয়টি কোন দিকে যাচ্ছে এবং সেটি আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
ভারতের জন্য এসব ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরিবর্তিত হচ্ছে। হাসিনার আমলে যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, দিল্লি এখন আর সেটিকে স্বাভাবিক বা নিশ্চিত ধরে নিতে পারছে না।
অন্যদিকে তারেক রহমানের সরকারেরও দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তার বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।
অধ্যাপক ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত।
তিনি বলেন, প্রতিবেশীদের একসঙ্গে বসবাস করতেই হয়।
শিগগিরই আরেকটি সুযোগ আসতে পারে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আগেভাগে তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া একটি ই-মেইলের পর এখন দিল্লির আশা—তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত ভারত সফরে আসবেন।