রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ার জেরে চরম বিপাকে পড়েছেন আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা ৮৬ জন দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী। হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় বর্তমানে তাদের ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিএমডিসি ও ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের কঠোর নীতিমালার কারণে অন্য কোনো হাসপাতালে মাইগ্রেশন করারও সুযোগ নেই শিক্ষার্থীদের। ফলে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিবিএস ও ইন্টার্নশিপ শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতায় এই হবু চিকিৎসকদের ডিগ্রির ভবিষ্যৎ এবং কার্যকারিতা এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-এর ভর্তি নীতিমালার ধারা ৭.০ এবং ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের (ফরেন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট লাইসেন্সিয়েট) রেগুলেশন্স, ২০২১-এর ৪(ক)(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোনো শিক্ষার্থীর এমবিবিএস ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য হতে হলে তাকে একই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে কোর্স এবং ইন্টার্নশিপ উভয়ই সম্পন্ন করতে হবে।
বিএমডিসির ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নীতিমালার ধারা ৭.১ এবং ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নীতিমালার ধারা ৭.০ এর নিয়ম অনুযায়ী, এমবিবিএস বা বিডিএস কোর্সের শিক্ষার্থীদের বিএমডিসি অনুমোদিত চলমান কারিকুলাম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে কোর্স শেষে নিজ নিজ মেডিকেল বা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালেই বিএমডিসি নির্ধারিত লগবুক অনুযায়ী এক বছরের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হবে, যেখানে অন্য কোনো মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপ মাইগ্রেশন করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
ভারতের কাশ্মীর থেকে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজে পড়তে আসা ডা. রেজা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি এখানে ৮ বছর ধরে আছি। এই কলেজ থেকেই আমি এমবিবিএস সম্পন্ন করেছি। আমাদের দেশের এনএমসি (ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন) গাইডলাইন অনুযায়ী, আমি মাইগ্রেশন নিয়ে অন্য কোথাও ইন্টার্নশিপ করতে পারব না। যদি অন্য কোথাও বাকি থাকা ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করি, তাহলে আমাদের দেশে আমার ডিগ্রির কোনো মূল্য থাকবে না। এনএমসি অনুযায়ী, যে মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা হয়েছে, সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ শেষ করতে হবে। শুধু আমি নই, আমাদের দেশ থেকে আসা সব শিক্ষার্থীর একই সমস্যা। সরকারের কাছে অনুরোধ, মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাদের জন্য যে সিদ্ধান্ত ভালো হবে, সেটি নেওয়া হোক। তবে এই মুহূর্তে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে অন্য কোথাও ইন্টার্নশিপ করা সম্ভব নয়।
৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এই হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেয় না, এখান থেকে চিকিৎসকও তৈরি হয়। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ফলে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে বিএমডিসি-এর সভাপতি ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এর আগে গত ১৫ জুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে হাসপাতালের অধ্যক্ষ বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হলেও মেডিকেল কলেজ বন্ধ হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য অন্য হাসপাতালে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে একটি জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করতে হবে। এরপর তারা নিজ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের ওই হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং নিয়ে আসবে।
এই শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানের মতো। আমরা চাই, তাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। কারিকুলাম ও নিয়মের মধ্যেই আমরা এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। গত পরশু আমার কাছে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী এসেছিল, তাদেরকেও আমরা একই আশ্বাস দিয়েছি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম এদিকে, শিক্ষা অধিদপ্তরের চিঠি পাওয়ার পরই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এমবিবিএস পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ বিষয়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা গত (শনিবার) ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে (সোমবার) সকাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করেন তারা। সেখানেও কারও সাক্ষাৎ পাননি। একই দিন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরেও যান শিক্ষার্থীরা। পরে সমস্যা সমাধানের জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের ২৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সাক্ষাৎ চাইলেও তা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-এর সভাপতি ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এই হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেয় না, এখান থেকে চিকিৎসকও তৈরি হয়। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ফলে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিএমডিসির ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষার্থী যে প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করবে, সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ শেষ করতে হবে। এখন হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় ইন্টার্ন করা শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েছে। দেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে বাংলাদেশে পড়তে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়তে পারে। তাই সরকারকে দ্রুত সমাধানে যেতে হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম বলেন, এই শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানের মতো। আমরা চাই, তাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। কারিকুলাম ও নিয়মের মধ্যেই আমরা এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। গত পরশু আমার কাছে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী এসেছিল, তাদেরকেও আমরা একই আশ্বাস দিয়েছি।