শুক্রবার ৬ আগস্ট ২০২১ ২১ শ্রাবণ ১৪২৮
 
শিরোনাম: এক দিনে আরও ২১৮ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে        করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ ২৬৪ জনের মৃত্যু       মাদকাসক্ত ছিলেন পরীমনি, সরবরাহ করতেন রাজ        পরীমনি-রাজসহ ৪ জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে র‍্যাব        এক সপ্তাহ পেছাল গণটিকা কার্যক্রম        কামাল বেঁচে যাওয়ায় নানা অপপ্রচার চালানো হয়: প্রধানমন্ত্রী       কাল থেকে শিল্পকারখানা খোলা, অভ্যন্তরীণ রুটে চলবে বিমান      


তবুও ঢাকামুখী মানুষের ঢল
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১, ৮:৪৭ পিএম |

* সাত জেলায় কঠোর লকডাউন চললেও মানুষের মধ্যে তার রেশ নেই
* এক সপ্তাহে ঢাকায় সংক্রমণ বেড়েছে ১১৪ শতাংশ
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ও ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখতে আশপাশের সাত জেলায় গত মঙ্গলবার থেকে কঠোর লকডাউন চলছে। আগামী ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত সারাদেশ থেকে রাজধানীকে বিচ্ছিন্ন রাখতেই সরকারের এই পদক্ষেপ। তবে সরকার কঠোর লকডাউন দিলেও তার রেশ নেই মানুষের মধ্যে। লকডাউন মানতে দেখা যায়নি জনসাধারণকে। তারা চলাচল করছেন স্বাভাবিক নিয়মেই। পার্থক্য শুধু এই- লকডাউনে থাকা ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর পরিবহন বন্ধ রয়েছে। তবু থামছে না ঢাকামুখী মানুষের ঢল। প্রাইভেটকারে বা হেঁটে ঢাকায় ঢুকছেন মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গাবতলী ও আমিনবাজার এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। এদিকে, দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এটিকে তৃতীয় ঢেউ বললেও অনেকেই বলছেন দ্বিতীয় ঢেউ তার আকার বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দেশে সংক্রমণের ২৪তম সপ্তাহে (গত এক সপ্তাহে) ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৪.৪ শতাংশ করোনা সংক্রমণ বেড়েছে। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে রংপুর বিভাগ, সেখানে সংক্রমণ বেড়েছে ৮৬.৭ শতাংশ। সংস্থাটি আরও বলছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪০টিই সংক্রমণের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে। এর ফলে প্রথমে সীমান্তবর্তী জেলা এবং পরে এসব জেলা থেকে সংক্রমণ ছড়িয়েছে পাশের জেলাগুলাতে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাড়ছে। এদিকে দেশে আগে থেকেই রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট, ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এবং নাইজেরিয়ার ইটা ভ্যারিয়েন্ট। দেশে এসব ভ্যারিয়েন্ট এবং মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতায় করোনা সংক্রমণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, আর এর ব্যত্যয় হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও শোচনীয় অবস্থায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে অধিদপ্তর। তারা সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে অনুরোধ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন জানিয়েছেন, রাজধানীর চারপাশের এলাকা থেকে যদি মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা না যায়, তাহলে ঢাকার করোনা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে যেতে পারে।
এখনও যদি দেশের সব জায়গায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাও করোনার ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আসতে অন্তত দুই সপ্তাহ লাগবে বলে জানান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘যেখানে যেখানে দুই সপ্তাহ আগে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে সেখানে কমতে থাকবে, যেখানে এক সপ্তাহ আগে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে সেখানে কিছুটা কমবে, আর এখন যেখানে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হবে তার ইফেক্ট দেখা যাবে দুই সপ্তাহ পরে।’
এ অবস্থায় করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত সোমবার ঢাকার আশপাশের চারটিসহ সাতটি জেলায় লকডাউন ঘোষণা করে। জেলাগুলোতে আগামী ৯ দিন জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই সাত জেলায় লকডাউন ঘোষণার পর থেকেই ঢাকার সঙ্গে সারাদেশে দূরপাল্লার বাস ও সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে রাজধানী ঢাকায় আসা বা যাওয়া- কোনটাই বন্ধ নেই। থেমে নেই মানুষের চলাচল। প্রাইভেটকারে বা হেঁটে ঢাকায় ঢুকছেন মানুষ।
রাজধানীর মিরপুর থেকে মাগুরা যাবেন মো. আবদুল ওয়াদুদ নামের একজন। গাবতলী পর্যন্ত বাসে চেপে এসেছেন। এরপর আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়েছেন পায়ে হেঁটে। তারপর প্রাইভেটকারে যাবেন পাটুরিয়া ঘাটে। কোনোভাবে ঘাট পার হয়ে ভেঙে ভেঙে চলে যাবেন নিজ বাড়িতে। আÍবিশ্বাসের সঙ্গেই তিনি জানান, ‘আমার যেতে কোনো সমস্যা হবে না।’ সরকার লকডাউন দিয়েছে তারপরও বাড়িতে যাচ্ছেন কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, পারিবারিক কাজ। সরকার তো গত একবছর ধরেই থেমে থেমে লকডাউন দিচ্ছে। সরকারের কথা শুনলে তো না খেয়ে থাকতে হবে। সরকার তাদের কাজ করছে, আর আমি আমার কাজ করছি।’
সুনীল নামের আরেকজন পাবনা থেকে রাজধানীতে ফিরেছেন। আমিনবাজার ব্রিজে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করি। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়িতে যাওয়ার পরই সরকার লকডাউন দিয়ে দেয়। কিন্তু আমার আজ অফিসে উপস্থিত থাকতেই হবে। এজন্য বাড়ি থেকে ভোরে  রওনা হয়েছি। নদী পার হয়ে প্রাইভেটকারে এলাম। গাবতলী গিয়ে অফিসের বাস ধরব।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাবতলী ফাঁকা থাকলেও আমিনবাজার ব্রিজের উপর থেকে তীব্র যানজট। প্রাইভেটকার ও ট্রাকের জটে মানুষ পায়ে হেঁটেই আমিনবাজার পাড়ি দিচ্ছেন। অন্যদিকে ট্যাক্সি ও ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার যাত্রী পরিবহন করছে। প্রাইভেটকারগুলো সুযোগ বুঝে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।
গাবতলীতে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সাভার থেকে হাজার হাজার মানুষ আসছে। রাজধানী থেকেও হাজার হাজার মানুষ ওইদিকে যাচ্ছে। আমরা কোনো গাড়ি যেতে দিচ্ছি না। কিন্তু সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘গাবতলীতে যানজট না থাকলেও এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে আমিনবাজারে যানজট লেগে আছে। জরুরি প্রয়োজনীয় গাড়িগুলো আমরা ছেড়ে দিচ্ছি।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। গত বছরের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ কমতে থাকে। তবে এ বছরের মার্চ থেকে সংক্রমণ আবার বাড়তে থাকে। সে সময় দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা হাজারের ওপরে চলে যায়। বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ১৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহামারিকালে একদিনে সর্বোচ্চ ১১২ জনের মৃত্যুর কথা জানায়। ওই সময় শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় পাঁচ এপ্রিল থেকে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যা এখনও বহাল রয়েছে।
এ বিধিনিষেধের ফলে সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে পড়ে। শহর ছেড়ে যাওয়া মানুষ গ্রামমুখী হয়, যেখানে স্বাস্থ্যবিধির কোনও বালাই ছিল না। এতে করে জনস্বাস্থ্যবিদরা আশঙ্কা করেন ঈদের পর সংক্রমণ আবার বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে দেশে ভারতীয় তথা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে রোগী বাড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতে জায়গা দিতে করোনা বেড বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলা হাসপাতালগুলো।









প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]