রোববার ১৬ মে ২০২১ ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
 
শিরোনাম: আল জাজিরা-এপির কার্যালয় ভবন গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল       রবিবার আসছে শ্রীলঙ্কা দল       বিএনপির উচিত প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো: তথ্যমন্ত্রী       সুস্থ, সচল ও অত্যাধুনিক ঢাকা গড়তে চান মেয়র আতিক       বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ছে ২৩ মে পর্যন্ত, প্রজ্ঞাপন রোববার       শনাক্ত ৩০০-এর নিচে, কমল মৃত্যুও       দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে উদ্বেগ      


বায়াস, বুলশিট, লাই: আস্থার সংকটে সংবাদমাধ্যম
মনজুরুল আহসান বুলবুল
প্রকাশ: সোমবার, ৩ মে, ২০২১, ২:০৯ পিএম |

এ বছর বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিপাদ্য হচ্ছে: জনকল্যাণের জন্য তথ্য। এর একটি ধারাবাহিকতা আছে। ১৯৯১ সালে নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোকে বিশ্বের গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা যখন সমবেত হয়েছিলেন তখন ছিল মূলত প্রিন্ট মিডিয়ার যুগ। সে কারণে ১৯৯১ সালের ৩ মে ‘উইন্ডহোক ঘোষণা’য় দাবি করা হয়েছিল মুক্ত, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক গণমাধ্যম।

২০০১ সালে উইন্ডহোক ঘোষণার প্রথম দশক পূর্তিতে যখন সম্প্রচার মাধ্যম দৃশ্যমান, তখন এয়ারওয়েভের মাধ্যমে সম্প্রচার এবং আফ্রিকান সম্প্রচার নীতি দৃশ্যমান হয়।

ঘোষণার দ্বিতীয় দশক পূর্তিতে, ২০১১ সালে এগিয়ে আসে ইউনেস্কো। দাবি জানান হয়: জনগণের তথ্য জানা ও পাওয়ার অধিকার। এর সূত্র ধরেই ২০১৯ সালে জাতিসংঘ ২৮ সেপ্টেম্বরকে ঘোষণা করে তথ্য জানার সর্বজনীন অধিকারের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে।

এ বছর ‘উইন্ডহোক ঘোষণা’র তৃতীয় দশক পূর্তিতে বলা হচ্ছে: জনকল্যাণের জন্য তথ্য। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণমাধ্যম ও জনগণের একটি যোগসূত্র গড়ে তুলতে বলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে আনা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে: সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রবাহে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম সম্পর্কে জনশিক্ষার সম্প্রসারণ, যাতে সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের মূল্য বোঝে এবং জনকল্যাণে তথ্যের দাবিতে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু এমন এক সময়ে এসব কথা বলা হচ্ছে, যখন জনগণের কাছে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

২০১৭ সালে রয়টার্স ইন্সটিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে ইউরোপ জুড়ে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এক জরিপ চালানো হয়। নিক নিউম্যান এবং রিচার্ড ফ্লেচারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই জরিপ চলে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আটটি দেশে। এগুলো হচ্ছে : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং গ্রিস।

আটটি দেশের হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে খোলা প্রশ্নের জবাব বিশ্লেষণ করে যে ফলাফল পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতেই এ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এই রিপোর্টের শিরোনামটিই হচ্ছে: বায়াস, বুলশিট, লাই। অভিধান বলছে ‘বায়াস’ মানে হচ্ছে : পক্ষপাত, একপেশে। ‘বুলশিট’ এর অর্থ: বাজে কথা, আবোল তাবোল কথাবার্তা। আর ‘লাই’ মানে : মিথ্যা, অসত্য।

জরিপের ফলাফল বলছে, সংবাদমাধ্যমের ওপর যাদের আস্থা নেই তাদের শতকরা ৬৭ ভাগ মনে করেন; অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম একপেশে, নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে সাংবাদিকতা করে। সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার চাইতে ক্ষমতাশালীদের বা প্রভাবশালী মহলের (শুধু ক্ষমতাসীন নয়) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই রক্ষা করে।

সাংবাদিকতার শক্তিই হচ্ছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা। সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট সাংবাদিকতায় নতুন ও প্রধান চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমের ভোক্তারা এখন আর গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করছে না, আস্থা রাখতে পারছে না। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী হয়তো অনেক কারণ।
যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের পাঠক, দর্শক শ্রোতাদের অভিযোগ, তাদের দেশে প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো পছন্দসই পক্ষের হয়ে কাজ করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, টেলিভিশনে যা দেখানো হয় তা থেকে সত্যের কাছাকাছি কিছুটা ধারণা নেওয়া যায়, কিন্তু দ্রুত খবর প্রচার করতে গিয়ে তারা প্রকৃত তথ্যকে পাশ কাটিয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারাও বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং ডেনমার্কে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ার চাইতে বেশি।

জরিপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার চিত্র বেশ করুণ। এদের বিশ্বাসযোগ্যতার পক্ষে মাত্র ২৪ ভাগের অবস্থান। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সত্যের চাইতে কল্পনাকেই গুরুত্ব বেশি দেয়। অসত্য তথ্য, নিজস্ব এজেন্ডা, প্রবল নিজস্ব মতামত নির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য দূষণের জন্যও দায়ী। তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অতিমাত্রায় পক্ষপাত ও এজেন্ডা নির্ভর সাংবাদিকতা বিপুলসংখ্যক মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।

এ ধরনের একটি জরিপ এই মুহূর্তে বাংলাদেশে করা হলে ফলাফল কী হবে তা ধারণা করা যায়। যদিও গণমাধ্যমের পশ্চিমা সংকট সবসময়ই আমাদের উপমহাদেশের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলে না। যেমন, এ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে সংবাদপত্রের ছাপানো সংস্করণ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, অনেক পত্রিকার ছাপানো সংস্করণের প্রচার সংখ্যা যখন কমে যেতে থাকে তখন বিপরীত চিত্রটি ছিল এ উপমহাদেশে। কিন্তু গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নবীশরাও জানবেন, সংখ্যার হিসাব গণমাধ্যমের গুরুত্ব মাপার কোনো মাপকাঠি নয়। যখন বলা হয়, এ সংবাদপত্রটি বা টিভি চ্যানেলটি ‘ভালো’ তার মানে হচ্ছে ওই সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলটির প্রতি বেশিসংখ্যক মানুষ আস্থা রাখে। সাংবাদিকতার শক্তিই হচ্ছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা।

সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট সাংবাদিকতায় নতুন ও প্রধান চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমের ভোক্তারা এখন আর গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করছে না, আস্থা রাখতে পারছে না। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী হয়তো অনেক কারণ। কিন্তু পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে নির্মোহভাবে তাকাতে হবে নিজেদের দিকেই। সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা গেলে বাইরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সহজ হয়।

যারা গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন তারা সরাসরি আঙ্গুল তুলেছেন সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি। তারা কখনো কখনো সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুলিয়ে ফেলছেন। বড় দাগে সব সংবাদমাধ্যমই গণমাধ্যমের অংশ কিন্তু সব গণমাধ্যম সংবাদমাধ্যম নয়। গতি বা সংযোগের দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্যই সনাতন সংবাদমাধ্যমের চাইতে অনেক এগিয়ে। কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক সূত্রও বটে। প্রযুক্তির আধুনিকতায় সমৃদ্ধ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখনো গণযোগাযোগের ‘ব্যক্তিগত মাধ্যম’, কোন অর্থেই ‘সংবাদমাধ্যম’ নয়।

প্রধান পার্থক্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধেয় (বিষয়বস্তু) নির্বাচন বা উপস্থাপনে সাংবাদিকতার কোনো ব্যাকরণ মানতে হয় না। কারণ সেখানে কোনো সম্পাদক নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার নামে আইডি, তিনিই মালিক, তিনিই সম্পাদক, তিনিই বার্তা সম্পাদক, তিনিই রিপোর্টার, তিনিই সাব এডিটর। একটি প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে, সাংবাদিকতা-সুলভ অনুসন্ধান, সব প্রশ্নের জবাব নিশ্চিতকরণ শেষে নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করে উপস্থাপন পর্যায়ে যেতে হয় বার্তা সম্পাদক বা সম্পাদকের চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সাংবাদিকতার এতসব ব্যাকরণ অনুসরণ করতে হয় না বলে তাকে সংবাদমাধ্যমের স্বীকৃতি দেওয়া যায় না।

কোনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শর্তহীন চূড়ান্ত অধিকার নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের যে অধ্যায়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে সেখানেও স্বাধীনতার সীমারেখাটি স্পষ্ট করা হয়েছে। শুধু আইন নয়; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নৈতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক এমনকি পারিবারিক মূল্যবোধ দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত। সামাজিক গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় এ সবের ধার ধারে না।

গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে উৎসটিকে দুইভাবে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে রাষ্ট্র বা সরকার সৃষ্ট সংকট। যেমন রাষ্ট্র প্রণীত কোনো কালো আইন, সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া, গণমাধ্যম বিষয়টি বুঝেনই না এমন মালিকানায় গণমাধ্যম তুলে দেওয়া, সরকার বা রাষ্ট্রের বাহিনীর হাতে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া।

যারা গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন তারা সরাসরি আঙ্গুল তুলেছেন সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি। তারা কখনো কখনো সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুলিয়ে ফেলছেন। বড় দাগে সব সংবাদমাধ্যমই গণমাধ্যমের অংশ কিন্তু সব গণমাধ্যম সংবাদমাধ্যম নয়।
অপরটি হচ্ছে রাষ্ট্র বা সরকারের বাইরের উৎস থেকে সৃষ্ট সংকট। যেমন সরকারের বাইরের প্রভাবশালী মহলের গণমাধ্যম বিদ্বেষী আচরণ, গণমাধ্যম পরিচালনায় বিশেষ মহলের হস্তক্ষেপ, গণমাধ্যমকর্মীদের বেতন ভাতা না দেওয়া, নারী কর্মীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, বিজ্ঞাপনদাতা-করপোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব, বিশেষ এজেন্ডা নির্ধারণে বিশেষ গোষ্ঠী বা মালিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ।

এই দুই সংকট মোকাবেলায় লড়াই একা একা করা যায় না, প্রয়োজন হয় জোটবদ্ধ শক্তির। প্রয়োজন হয় নাগরিক সমাজের সহায়তার, গড়ে তুলতে হয় সামাজিক আন্দোলনও। যেমন বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইনটি অর্জিত হয়েছিল সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগেই। 

অন্যদিকে সাংবাদিককে তার পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেকেই তৈরি করতে হবে যোগ্যতর করে। সাংবাদিকতা হচ্ছে একটি পেশা, যেখানে কুমিরভর্তি পুকুরে নিজেকে বাঁচিয়ে সাঁতার কাটার দক্ষতা অর্জন করাই একমাত্র বেঁচে থাকার উপায়। এই কুমির কখনো সরকার, কখনো রাজনৈতিক দল, কখনো ভূমিদস্যু, কখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সেন্সর আরোপকারী কর্তৃপক্ষ, কখনো করপোরেট স্বার্থবাহী গোষ্ঠী, কখনো বিজ্ঞাপনদাতা এমনকি কখনো মালিক নিজেই।

সাংবাদিকতা আগাগোড়াই বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষের পেশা। এজন্যই এই পেশার দায়িত্বশীলতা আরোপিত হয় না। একজন সাংবাদিক তার মেধা ও মননশীলতা দিয়েই দায়িত্বশীলতা নির্ধারণ করেন। এর সঙ্গে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যুক্ত হয় সমাজ। কারণ একজন সাংবাদিক যখন তথ্য সংগ্রহ করেন বা কোনো মতামত দিতে চান তার কোনটাই তার ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে করেন না; করেন সমাজ ও মানুষের বৃহত্তর স্বার্থেই। একজন সাংবাদিক যখন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অপকর্ম নিয়ে খবর প্রচার বা প্রকাশ করেন তখন প্রথম শর্তটিই হচ্ছে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ হাতে রাখা।

দ্বিতীয় আবশ্যিক শর্তটি হচ্ছে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ দুটি প্রাথমিক শর্ত অনুসরণ করা হলে প্রচারিত খবরটি কোনো বিশিষ্টজনকে হেয় করার জন্য করা হয়েছে, এমনটি বলার সুযোগ থাকবে না। তখন এ রিপোর্টটিকে ‘বায়াস, বুলশিট বা লাই’ বলা যাবে না। চূড়ান্ত বিচারে কিন্তু এ খবরটি প্রকাশের বেলাতেও সাংবাদিক নিরপেক্ষ নন। কারণ সাংবাদিকতার দায় হচ্ছে সেই সব ভোটারদের প্রতি, যারা এ জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেছিলেন। এ খবরের তথ্যই প্রমাণ করবে যে ভোটাররা ভুল মানুষকে নির্বাচিত করেছিলেন। 

সংবাদমাধ্যমের মৌলিক দায়িত্বের দ্বিতীয়টিই হচ্ছে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা; মানুষকে সচেতন করে তোলা। ওই রিপোর্টটি প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকেও সতর্ক করা হলো, যাতে ভবিষ্যতে তারা প্রার্থী বাছাইয়ের বেলায় সঠিক মানুষটিকে বেছে নিতে পারেন। বড় দাগে এ রিপোর্টটি পরোক্ষভাবে আমাদের রাজনীতি থেকে অসৎ, দুর্নীতিবাজ অপরাজনীতিকদের দূর করার সামাজিক দায়িত্বও পালন করল।

সংবাদমাধ্যমের এই চ্যালেঞ্জগুলো নতুন নয়, কালের বিবর্তনে শুধু চেহারা বদল হয়েছে। সতেরো শতকের শেষদিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার থেকে সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠলো সমাজের ‘ওয়াচডগ’। এই বঙ্গে কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। তবে কালক্রমে গণমাধ্যমে পুঁজি হাজির হলো নতুন একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সংকট নিয়ে। কারণ পুঁজি এবং পেশাদারিত্বেও সংকট দাঁড়ালো একেবারে মুখোমুখি।

আজ যখন সংবাদমাধ্যমকে পক্ষপাতিত্বের বা বিশেষ এজেন্ডা স্থাপনের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে এর মূলে রয়েছে মালিকানা। অল্পক্ষেত্রে পেশাদার উঁচু পর্যায়ের সাংবাদিকরা থাকলেও কিছু ব্যতিক্রম বাদে পুঁজি বিনিয়োগকারীর চরিত্রই নির্ধারণ করছে একেকটি সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় চরিত্র। সেখানে সম্পাদক নামে ঠুঁটো জগন্নাথটি না পারছে পেশাদারী সাংবাদিকতার দায়িত্বটি পালন করতে; না পারছে মালিকের চোখ রাঙানির বাইরে যেতে।

এ দোদুল্যমানতার কারণেই সংবাদমাধ্যম আস্থা হারাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে কার স্বাধীনতা। পুঁজির স্বাধীনতা নাকি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা? এ প্রশ্নের জবাব মেলে না। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা ধর্মবিশ্বাসীদের নিজস্ব মতবাদ নিয়ে কোনো প্রকাশনা বা সম্প্রচার মাধ্যম হতে পারবে না এমন নয়; কিন্তু গণ্ডগোল বাঁধে যখন এই বিশেষ মতবাদীরা নিজেদেরও নিরপেক্ষ দাবি করতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাশালীদের দাপট। এই ক্ষমতাশালী যে সবসময় সরকার পক্ষের তাও নয়। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে এদের চেহারা বদল হয়। এরা আনুষ্ঠানিক কোনো সেন্সরশিপ আরোপ করে না, কিন্তু এদের হম্বিতম্বিতে সংবাদমাধ্যম গুটিয়ে যায় বা নিষ্ক্রিয় থাকে। এরা সাংবাদিক হত্যা করে, সাংবাদিকদের নির্যাতন করে, আইনি বিপাকে ফেলে, হত্যার হুমকি দেয় কিন্তু এ সবের কোনো বিচার হয় না।

একবারে নতুন কৌশল; ধামাধরা নিম্নমানের সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে, অপসাংবাদিকতার মিছিল বাড়িয়ে নৈতিকতা বা পেশাগত মর্যাদায় উন্নত গণমাধ্যমকে অমর্যাদাকর জায়গায় ঠেলে দিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবাদিকদের নানা উচ্চাভিলাষের জন্য পেশা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের সংমিশ্রণ, বিশেষ ক্ষমতাশালী মহলের মুখপত্রে পরিণত হওয়া ইত্যাকার নানা বিষয়।

বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যম দিবসে যখন টিকে থাকা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে তখন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট থেকে সংবাদমাধ্যমকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে পেশাদার সাংবাদিকদেরই। অপরাজনীতি যেমন রাজনীতিকে গ্রাস করে ফেলে, তেমনি অপসাংবাদিকতাও প্রকৃত পেশাদারী সাংবাদিকতাকে গ্রাস করে ফেলতে উদ্যত আজ। ভালো সাংবাদিকতাই কেবল সাংবাদিকতাকে রক্ষা করতে পারে।

মনজুরুল আহসান বুলবুল ।। এডিটর ইন চিফ, টিভি টুডে 







 সর্বশেষ সংবাদ

আল জাজিরা-এপির কার্যালয় ভবন গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল
বিচ্ছেদের ৪ বছর পর আজ মুখোমুখি হচ্ছেন তাহসান-মিথিলা!
রবিবার আসছে শ্রীলঙ্কা দল
বিএনপির উচিত প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো: তথ্যমন্ত্রী
সুস্থ, সচল ও অত্যাধুনিক ঢাকা গড়তে চান মেয়র আতিক
বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ছে ২৩ মে পর্যন্ত, প্রজ্ঞাপন রোববার
শনাক্ত ৩০০-এর নিচে, কমল মৃত্যুও
আরো খবর ⇒

 সর্বাধিক পঠিত

মিরপুর প্রেসক্লাবের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা উন্নয়ন শীর্ষক আলোচনা ও ইফতার মাহফিল
বাক প্রতিবন্ধী মিতুর পরিবারের পাশে উপজেলা চেয়ারম্যান হামিদ মাস্টার
জেনিফার ফেরদৌসের উপস্থাপনায় বিটিভিতে আজ ঈদের বিশেষ `ছায়াছন্দ'
শান্তিসংঘ'র আয়োজনে ছিন্নমূল মানুষের জন্য ইফতার আয়োজন
গাজীপুর সাংবাদিকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার বিতরণ
গৌরনদী প্রেসক্লাব এর উদ্যোগে ইফ্তার মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত
গোল্ডেন মনির ও সিরাজগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]