প্রকাশ: শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৪, ৬:৩৭ PM
যশোরের সাবেক জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দূদক। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বানিজ্য, ক্রয় বানিজ্য, লাইসেন্স বানিজ্যসহ এলআরডি ফান্ড কালেকশন নানা প্রকারে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ উটেছে সাকেব ডিসির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি অবৈধ পন্থায় ও জ্ঞাত আয় বর্হিভূত বিপুল পরিমান সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসন ক্যাডারের ৪৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে এই ৪৯ কর্মকর্তা নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদেরই একজন যশোরের সাবেক জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। তিনি যশোরে যোগদানের পর পরই যশোর বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার মিশন নিয়ে কার্যকাল শুরু করেছিলেন । তার সাফ ঘোষনা ছিলো, যশোরে বিএনপি থাকবে না। তিনি তার কর্মকালীন সময়ে যশোরে বিএনপি ও এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একপ্রকার তার দপ্তরে নিষিদ্ধ করেন। একই সাথে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের ক্ষমতাবলে তিনি পুলিশকে ব্যবহার করে জেলা বিএনপি ও এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগটনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে যারপরনায় মারাত্নক ভাবে হয়রানী ও গ্রেফতার বানিজ্য করে ব্যাপত পরিমান অর্থ বাণিজ্য করার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত। ৫ আগষ্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিলে তার সরকারের পতন ঘটে। পরীবর্তিত পরিস্তিতিতে যশোরের সাবেক জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের শাস্তি ও বিচার দাবি করে জেলা বিএনপি বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের পাশাপাশি আল্টিমেটাম দিয়েছে। এদিকে বিগত দিনে বৈষম্যের শিকার যশোরের সাধারণ মানুষের পক্ষেও সাবেক ডিসির বিচার দাবি করে নানা কর্মসূচী পালিত হচ্ছে।
মোঃ তমিজুল ইসলাম খান। যশোরের ৩৩তম জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে ২০২০ সালের ৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত টানা তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। আমলাতন্ত্রের পুরোটাই তখন আওয়ামী প্রভাবদুষ্ট। তারপরও অনেক জেলাতেই প্রশাসনের কর্তারা বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের কথাবার্তাকে গুরুত্ব না দিলেও অন্তত শুনতেন। কিন্তু তমিজুল ইসলাম খান যশোরের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধীদলগুলোর থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের তার অফিসে যাওয়া তো দূরের কথা, কোথাও তার কাছাকাছি পৌঁছালেই ভুত দেখার মতো তিনি আঁতকে উঠতেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সাংবাদিকদের মধ্যে যারা তার সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশতেন, তাদেরকে তিনি প্রায়ই বলতেন, যশোর বিএনপিকে শেষ করে দিয়ে যাবেন তিনি। সূত্র বলছে, যদিও যশোর বিএনপিকে তিনি কিছুই করতে পারেননি। তবে নিজে যশোর থেকে কামিয়ে নিয়ে গেছেন কোটি কোটি টাকা। নানান দিবস ও প্রোগ্রামের কথা বলে দফায় দফায় যশোরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। যেসব ব্যবসায়ীরা লাখ টাকার ওপরে বড় বড় অংকের চাঁদা দিতেন, তাদের রিসিট দেওয়া হতো। কিন্তু বাকিদের কোন রিসিট দেওয়া হতো না। অনেক ব্যবসায়ীর কাছে এখনও সেসব রিসিট সংরক্ষিত আছে। চাঁদার টাকায় যশোরের কিছু ঘনিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা ও কাছের অফিসারদের নিয়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই জেলা প্রশাসকের আলীশান বাংলোয় পার্টি হতো। যা তদন্ত করলে খুব সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব।
সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে যশোর জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর যশোরের জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন। এসময় তিনি কার্যালয়ে থাকা সত্ত্বেও তার ব্যক্তিগত সহকারীকে পাঠিয়েছিলেন স্মারকলিপি নেওয়ার জন্য। কিন্তু বিএনপির নেতারা জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে স্মারকলিপি না দিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্ত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। এ ব্যাপারে যশোর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব এ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘বিপুল সংখ্যক বিএনপি নেতা-কর্মীকে দেখে প্রথমে জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম নিজে স্মারকলিপি নিতে অস্বীকার করেন ও ব্যক্তিগত সহকারীকে পাঠিয়ে দেন। আমরা অনুরোধ করি, দুই-তিনজন নেতৃবৃন্দ গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে চলে আসবো, কোন বিশৃঙ্খলা হবে না। কিন্তু তিনি কোনভাবেই স্মারকলিপি নিতে রাজি হননি’।
ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের অফিস কক্ষে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাদের একজন জানিয়েছেন, ওই সময় তার কক্ষে উপস্থিত বেশ কয়েকজনের কাছে জানতে চান যে, বিএনপির স্মারকলিপি নেওয়া ঠিক হবে কিনা। সবাই হ্যাঁ-সুচক মতামত দেন। জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান তখন আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছে ফোন দিয়ে জানতে চান যে তারা বিএনপির স্মারকলিপি নিচ্ছেন কিনা। বেশিরভাগ জেলা প্রশাসকই স্মারকলিপি নিচ্ছেন বলে জানান। এরপরও সেসময় যারা অফিসে উপস্থিত ছিলেন, তাদের উদ্দেশে তমিজুল ইসলাম খান বলেন, যে নেয় নিক, আমি বিএনপির স্মারকলিপি নেব না।
এদিকে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বানিজ্য, ক্রয় বানিজ্য, লাইসেন্স বানিজ্যসহ নানা প্রকারে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে প্রশাসন ক্যাডারের ৪৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে এই ৪৯ কর্মকর্তা নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ৪৯ কর্মকর্তার এই তালিকায় যশোরের সাবেক জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খানের নামও রয়েছে। তমিজুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করায় যশোরের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহল উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তমিজুল ইসলাম খানের সব দুর্নীতি ও অনিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বের করে উপযুক্ত শাস্তি যেন নিশ্চিত করা হয়।